ব্যস্ত নগরী ঢাকায় যানজটের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ক্রমেই সামনে আসছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল। অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক পর্যন্ত এসব যান ছড়িয়ে পড়ায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বাড়ছে চাপ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেছেন, শুধু সড়কে অভিযান চালিয়ে বা অটোরিকশা জব্দ করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর সঙ্গে নিবন্ধন, চার্জিং ব্যবস্থা, জিপিএস ও জিওফেন্সিং যুক্ত করে সমন্বিত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সম্প্রতি ডিএমপি সদর দপ্তরে জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক তৌহিদুজ্জামান তন্ময়। আনিছুর রহমান বলেন, অটোরিকশা বর্তমানে ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান একটি সমস্যা। তবে এর পেছনে মানুষের যাতায়াতের চাহিদাও রয়েছে। পর্যাপ্ত গণপরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন ফিডার সড়কে বসবাসকারী মানুষ মূল সড়কে আসা-যাওয়ার জন্য অটোরিকশার ওপর নির্ভর করছেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন। তাঁদের একটি অংশ অটোরিকশা চালানোকে তুলনামূলক সহজ পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। ফলে একদিকে যাত্রীর চাহিদা, অন্যদিকে চালকের সংখ্যা বাড়তে থাকায় রাজধানীর সড়কে অটোরিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, ঢাকার ধারণক্ষমতা ও বিদ্যমান সক্ষমতা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। ঈদের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছেড়ে গেলে শহরের যানজট ও চলাচলের পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তন দেখা যায়, তাতেই জনসংখ্যার চাপের বিষয়টি কিছুটা বোঝা যায়। তাঁর মতে, সীমিত জায়গায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে পরিবহন ব্যবস্থায় এ ধরনের চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

অটোরিকশার সংখ্যা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাজধানীকে আটটি জোনে ভাগ করার প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে বলেও জানান আনিছুর রহমান। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিভিন্ন জোনের অটোরিকশাকে আলাদা রঙের মাধ্যমে শনাক্ত করা হতে পারে। একই সঙ্গে অটোরিকশার চলাচল নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে প্রযুক্তির ব্যবহার করা হবে। ঢাকার অটোরিকশাগুলোকে আটটি জোনে ভাগ করার পরিকল্পনার কথা এর আগেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল।

অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গ্যারেজ ও চার্জিং ব্যবস্থাকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আনিছুর রহমান বলেন, গ্যারেজে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হলে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার বা বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই গ্যারেজভিত্তিক চার্জিংয়ের পরিবর্তে নির্দিষ্ট ব্যাটারি সোয়াপিং স্টেশন চালুর প্রস্তাব নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এতে অটোরিকশা এবং ব্যাটারির ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করা সম্ভব হবে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে অটোরিকশা চালককে গাড়ি নিয়ে নির্দিষ্ট স্টেশনে গিয়ে ব্যবহৃত ব্যাটারির পরিবর্তে চার্জ দেওয়া ব্যাটারি নিতে হবে। এর সঙ্গে জিপিএস ও জিওফেন্সিং প্রযুক্তি যুক্ত করা হলে কোন অটোরিকশা কোথায় চলাচল করছে, তা নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি করা সহজ হতে পারে বলে মনে করছেন ডিএমপির এই কর্মকর্তা।

অটোরিকশার মালিকানা ও গ্যারেজ ব্যবস্থাপনাতেও সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। যারা অটোরিকশার গ্যারেজ করেছেন বা করবেন, তারা একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সর্বোচ্চ পাঁচটি অটোরিকশা গ্যারেজে রাখতে পারবেন। এর বেশি অটোরিকশা রাখার সুযোগ থাকবে না বলে জানিয়েছেন আনিছুর রহমান। এতে অটোরিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মালিক ও গ্যারেজের তথ্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এদিকে অবৈধ চার্জিং বন্ধে ইতোমধ্যে বিভিন্ন গ্যারেজে অভিযান চালাচ্ছে ডিএমপি। অভিযানে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ডিপিডিসি ও ডেসকোর সংশ্লিষ্টদেরও যুক্ত করা হচ্ছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ শনাক্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর দায়িত্ব থাকায় তাদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটদেরও এসব অভিযানে যুক্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।

আনিছুর রহমান বলেন, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে আগের মতো শুধু সড়কে অভিযান চালিয়ে গাড়ি ডাম্পিং করার কৌশলের ওপর নির্ভর না করে অবৈধ চার্জিং বন্ধের দিকেও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, অটোরিকশার সংখ্যা, চলাচলের এলাকা, মালিকানা ও চার্জিং ব্যবস্থাকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে পারলে সমস্যাটি নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে। এ জন্য আট জোন, আলাদা রং, নিবন্ধন, ব্যাটারি সোয়াপিং, জিপিএস ও জিওফেন্সিং—এসব ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের প্রস্তাব সামনে এসেছে।

তবে এসব পরিকল্পনা এখনো বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। ফলে প্রস্তাবিত জোনভিত্তিক চলাচল, ব্যাটারি সোয়াপিং বা প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি পুরোপুরি চালু হলে রাজধানীর যানজট ও জনদুর্ভোগ কতটা কমবে, তা বাস্তব প্রয়োগের ওপর নির্ভর করবে।

সূত্র: Jagonews24।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!