জীবনের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে জমি কিনতে গিয়ে সামান্য অসতর্কতাও ডেকে আনতে পারে দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতা ও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি। তাই জমি কেনার আগে শুধু দাম বা অবস্থান দেখলেই হবে না, জমির মালিকানা, রেকর্ড, দখল ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রসহ সম্ভাব্য বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।

‘রেকর্ড সংশোধন মামলা ও খতিয়ানে ভুল সংশোধন পদ্ধতি’ বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৭৭ ও ১৭৮ নম্বর পৃষ্ঠায় জমি কেনার সময় করণীয় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেছেন লেখক সাইফুল ইসলাম ফকির। লেখকের উল্লেখ করা ভূমি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, জমি কেনার ক্ষেত্রে সাতটি বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

১. সরেজমিনে জমি দেখে নিন

জমি কেনার আগে প্রথমেই প্রস্তাবিত জমিতে নিজে গিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করা উচিত। কাগজপত্রে জমির বিবরণ ঠিক থাকলেও বাস্তবে জমিটির অবস্থা কী, তা সরাসরি না দেখলে বোঝা সম্ভব নয়।

সরেজমিনে গেলে জমিটি ব্যবহারের উপযোগী কি না, সেটিও বোঝা যায়। জমিটি নিচু, ডোবা, নালা বা পুকুর কি না কিংবা বাস্তবে প্রস্তাবিত জমির সঙ্গে কাগজপত্রের বর্ণনার মিল আছে কি না, সেসব বিষয়ও দেখা প্রয়োজন।

২. স্থানীয় বাসিন্দা ও পাশের জমির মালিকদের সঙ্গে কথা বলুন

জমির আশপাশের বাসিন্দা এবং সংলগ্ন জমির মালিকদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়রা জমিটির মালিকানা, দখল, পূর্বের বিরোধ কিংবা অন্য কোনো সমস্যা সম্পর্কে তথ্য দিতে পারেন।

বিশেষ করে জমি নিয়ে কোনো বিরোধ, ওয়ারিশের দাবি বা অন্য কারও মালিকানা-সংক্রান্ত দাবি আছে কি না, তা স্থানীয়ভাবে খোঁজ নেওয়ার মাধ্যমে আগেই জানা যেতে পারে।

৩. মালিকানার কাগজপত্র নিয়ে ভূমি অফিসে যাচাই করুন

জমির মালিকানা যাচাইয়ের জন্য বিক্রেতার কাছ থেকে মূল দলিলের ফটোকপি ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাগজপত্র সংগ্রহ করতে হবে। এর মধ্যে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মূল দলিল, ওয়ারিশ সনদ, সিএস/এসএ/আরএস/মহানগর/নামজারি পরচা, ডিসিআর এবং হালনাগাদ খাজনার দাখিলা বা রশিদ থাকতে হবে।

এসব কাগজপত্র সংগ্রহের পর ইউনিয়ন ভূমি অফিস বা তহশিল অফিসে গিয়ে যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সেখানে জমিটি সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট কি না, যেমন খাস, ভিপি, পরিত্যক্ত, অধিগ্রহণকৃত, কোর্ট অব ওয়ার্ডস কিংবা ওয়াক্ফ সম্পত্তি কি না, তা যাচাই করা যায়।

এ ছাড়া খাজনার রশিদ সঠিক কি না এবং প্রস্তাবিত দাগ ও খতিয়ানে প্রকৃত মালিকের তথ্য কী, সেসব বিষয়ও যাচাই করা প্রয়োজন।

৪. এসিল্যান্ড অফিসে মিউটেশন যাচাই করুন

বিক্রেতার নামে জমিটির নামজারি বা মিউটেশন সঠিকভাবে হয়েছে কি না, তা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড অফিস থেকে যাচাই করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে মিউটেশন পরচা ও ডিসিআরের তথ্য পরীক্ষা করা জরুরি। লেখকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যার কাছ থেকে জমি কেনা হচ্ছে তাঁর নামে নামজারি বা মিউটেশন না থাকলে ওই জমির রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হবে না।

৫. জমিতে সাইনবোর্ড দিন, প্রয়োজনে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিন

কাগজপত্র যাচাই করে জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কিংবা বায়না চুক্তি করলে জমিতে নিজের নাম ও ঠিকানা, দাগ নম্বর এবং খতিয়ান নম্বর উল্লেখ করে সাইনবোর্ড দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি জাতীয় বা স্থানীয় পত্রিকায় ছোট বিজ্ঞপ্তি দেওয়া যেতে পারে। এতে জমির বিষয়ে অন্য কোনো দাবিদার, ওয়ারিশ কিংবা মামলা-মোকদ্দমা থাকলে তা প্রকাশ্যে আসার সুযোগ তৈরি হয়।

এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ দেখা দিলে আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় সুবিধা পাওয়ার সুযোগও থাকতে পারে। একই সঙ্গে আগেই কোনো সমস্যা জানা গেলে ক্রেতা জমিটি কেনার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।

৬. ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন করুন, প্রমাণ রাখুন

জমি কেনার আর্থিক লেনদেনে প্রতিটি রশিদের অনুলিপি ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ করা উচিত। একই সঙ্গে লেনদেনের সময় সাক্ষী রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নগদ অর্থের পরিবর্তে যতটা সম্ভব চেক বা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে লেনদেন করাকে তুলনামূলক নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন লেখক। এতে অর্থ লেনদেনের একটি নথিভুক্ত প্রমাণ থাকে।

৭. মধ্যস্বত্বভোগী এড়িয়ে প্রকৃত মালিকের সঙ্গে কথা বলুন

জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে সম্ভব হলে সরাসরি প্রকৃত মালিকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা না করাই ভালো।

প্রকৃত মালিকের সঙ্গে সরাসরি কথা বললে জমিটির মালিকানা ও নিষ্কণ্টকতার বিষয়ে বিভ্রান্তি কমার পাশাপাশি দামদরের ক্ষেত্রেও ভুল তথ্য বা প্রতারণার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

সবশেষে লেখকের বিশেষ পরামর্শ হলো, জমি কেনার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। শুধু কম দামে জমি পাওয়া যাচ্ছে—এমন আকর্ষণে পড়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই বাদ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। জমির কাগজপত্র, মালিকানা ও বাস্তব অবস্থা ভালোভাবে যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নিলে পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতার পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হতে পারে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!