কলম্বিয়ার ফুটবলে শেষ হলো একটি স্মরণীয় অধ্যায়। দেশটির কিংবদন্তি মিডফিল্ডার ও অধিনায়ক জেমস রদ্রিগেজ আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক আবেগঘন ভিডিও বার্তায় ৩৫ বছর বয়সী এই তারকা জানান, কলম্বিয়া জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে নামবেন না তিনি। দীর্ঘ ১৫ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে দেশটির হয়ে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন জেমস। ২০২৬ বিশ্বকাপই হয়ে থাকল জাতীয় দলের জার্সিতে তার শেষ বড় মঞ্চ। বিদায়ের সময় তিনি জানান, কলম্বিয়ার প্রতিনিধিত্ব করা তার জীবনের অন্যতম বড় সম্মান এবং তিনি গর্বের সঙ্গে এই অধ্যায় শেষ করছেন।

জেমসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরু হয়েছিল একেবারে তরুণ বয়সে। ২০১১ সালে কলম্বিয়ার জাতীয় দলে অভিষেকের পর ধীরে ধীরে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন তিনি। এরপর একের পর এক বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে কলম্বিয়ার আক্রমণভাগকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই প্লেমেকার। তার অসাধারণ পাসিং, দূরপাল্লার শট, গোল করার ক্ষমতা এবং সৃজনশীলতা তাকে কলম্বিয়ার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। জাতীয় দলের হয়ে ১৩১টি ম্যাচ খেলে তিনি করেছেন ৩১ গোল। ম্যাচসংখ্যার দিক থেকে তিনি কলম্বিয়ার ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ের খেলোয়াড়দের একজন এবং গোলের দিক থেকেও রয়েছেন শীর্ষ সারিতে।

তবে জেমস রদ্রিগেজের নাম উচ্চারণ করলেই সবার আগে যে বিশ্বকাপটির কথা মনে পড়ে, সেটি হলো ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ। মাত্র ২২ বছর বয়সে সেই আসরে জেমস পুরো ফুটবল বিশ্বকে চমকে দেন। পাঁচ ম্যাচে ছয় গোল করে তিনি টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে গোল্ডেন বুট জিতে নেন। উরুগুয়ের বিপক্ষে তার করা দুর্দান্ত ভলি গোলটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে জায়গা করে নেয়। সেই বিশ্বকাপে কলম্বিয়াকে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতেও বড় ভূমিকা ছিল তার। অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর ইউরোপের অন্যতম বড় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ তাকে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ইউরোতে দলে নেয়।

জাতীয় দলের হয়ে শুধু ২০১৪ বিশ্বকাপেই নয়, পরবর্তী সময়েও জেমস ছিলেন কলম্বিয়ার অন্যতম প্রধান মুখ। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ এবং ২০২৬ সালের বিশ্বকাপেও তিনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিনি কলম্বিয়ার হয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা ফুটবলার হওয়ার রেকর্ডও গড়েন। এর আগে এই রেকর্ডের সঙ্গে কার্লোস ভালদেরামা ও ফ্রেডি রিনকনের মতো কিংবদন্তিদের নাম জড়িত ছিল। ২০২৬ আসরে উজবেকিস্তান, কঙ্গো ডিআর এবং পর্তুগালের বিপক্ষে মাঠে নেমে বিশ্বকাপে তার মোট উপস্থিতি ১১-তে পৌঁছায়।

২০২৬ বিশ্বকাপের পরও জেমসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। এমনকি বিশ্বকাপের আগে তার অবসর নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে মে মাসে সেই গুঞ্জন সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছিলেন জেমস নিজেই। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, তার আরও কয়েক বছর খেলার ইচ্ছা রয়েছে এবং অবসরের সিদ্ধান্ত তিনিই ঘোষণা করবেন। শেষ পর্যন্ত কয়েক মাস পর সেই সিদ্ধান্ত নিজেই জানালেন তিনি। অর্থাৎ জাতীয় দল থেকে বিদায় নেওয়ার সিদ্ধান্তটি এসেছে বিশ্বকাপের পর, যখন তিনি নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একটি স্বাভাবিক সমাপ্তি টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

জাতীয় দলের জার্সিতে জেমসের শেষ ম্যাচটি আসে ২০২৬ বিশ্বকাপে। কলম্বিয়া নকআউট পর্বে পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়। সেই ম্যাচের পরই কার্যত শেষ হয়ে যায় কলম্বিয়ার হয়ে জেমসের বিশ্বকাপ অভিযান। এরপর ১৫ সেপ্টেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় দলকে বিদায় জানান। আবেগঘন বার্তায় তিনি সতীর্থ, কোচ, পরিবার এবং সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পাওয়া ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্যও কলম্বিয়ার মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।

অবাক করার মতো বিষয় হলো, জাতীয় দলকে বিদায় জানালেও জেমস এখনও পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নেননি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তির মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি কলম্বিয়ার ক্লাব ফুটবলে ফিরেছেন। প্রায় ১৯ বছর পর নিজের দেশে ফিরে জেমস চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন আতলেতিকো নাসিওনালের সঙ্গে। ক্লাবটির সঙ্গে তার চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। ফলে এখন থেকে তার ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায় হবে ক্লাব ফুটবলকে ঘিরে।

জেমস রদ্রিগেজের বিদায় তাই শুধু একজন ফুটবলারের অবসর নয়; এটি কলম্বিয়ার ফুটবলের একটি প্রজন্মের বিদায়। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেই দুর্দান্ত ‘১০ নম্বর’ থেকে জাতীয় দলের অধিনায়ক—দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি এখন সরে দাঁড়ালেন আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে। ১৩১ ম্যাচ, ৩১ গোল, তিনটি বিশ্বকাপ এবং অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত রেখে যাচ্ছেন তিনি। কলম্বিয়ার জার্সিতে হয়তো আর তাকে দেখা যাবে না, কিন্তু ২০১৪ সালের গোল্ডেন বুটজয়ী সেই জেমস রদ্রিগেজ এবং তার বাঁ পায়ের জাদু দেশটির ফুটবল ইতিহাসে বহুদিন বেঁচে থাকবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!