লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হয়ে গেলেও তাঁকে ঘিরে বিদায়ী ম্যাচের সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ৩১ আগস্ট ২০২৬ মেসি আনুষ্ঠানিকভাবে আর্জেন্টিনার জার্সিতে আর না খেলার সিদ্ধান্ত জানান। এর কয়েক সপ্তাহ আগে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে হারের পর তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়েছিল। অবশেষে অবসরের ঘোষণা দিয়ে মেসি জানান, সিদ্ধান্তটি তাঁর জন্যও আবেগপূর্ণ ছিল, তবে সময় এসেছে নতুন প্রজন্মকে সুযোগ দেওয়ার। এরপর থেকেই আর্জেন্টিনার ফুটবলভক্তদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে—দেশের জার্সিতে এত দীর্ঘ ও গৌরবময় ক্যারিয়ারের পর মেসিকে কি আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানোর জন্য আরেকটি ম্যাচ আয়োজন করা হবে?
এই সম্ভাব্য বিদায়ী আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন মেসি নিজেই। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন মেসির অবদানের প্রতি সম্মান জানাতে একটি বিশেষ বিদায়ী ম্যাচের পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছে বলে আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এখনো বিষয়টি পুরোপুরি চূড়ান্ত নয় এবং মেসির নিজের সম্মতিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে তাঁর শারীরিক অবস্থা, ব্যক্তিগত সময়সূচি এবং মানসিক প্রস্তুতিও বিবেচনায় থাকবে। তাই বিভিন্ন প্রতিবেদনে মেসিকে সম্ভাব্য স্কোয়াডে রাখার কথা বলা হলেও এটিকে এখনই চূড়ান্ত দল ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি তাঁকে সম্মান জানিয়ে একটি বিশেষ বিদায়ী মুহূর্ত তৈরির সম্ভাব্য পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সম্ভাব্য এই বিদায়ী ম্যাচের সময় নিয়েও তৈরি হয়েছে আগ্রহ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত বিস্তৃত আন্তর্জাতিক বিরতিতে আর্জেন্টিনার একাধিক প্রীতি ম্যাচের সূচি রয়েছে। বর্তমান সূচি অনুযায়ী ৩০ সেপ্টেম্বর কর্ডোবায় বলিভিয়ার বিপক্ষে এবং ৩ অক্টোবর বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে ম্যাচ রয়েছে; ৬ অক্টোবর একই ভেন্যুতে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচও নির্ধারিত হয়েছে। ফলে এই সময়ের কোনো একটি ম্যাচকে মেসির আনুষ্ঠানিক বিদায়ের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে কোন ম্যাচে তিনি খেলবেন বা আদৌ মাঠে নামবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি।
মেসিকে বিদায় জানানোর পরিকল্পনার পেছনে রয়েছে তাঁর অসাধারণ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেকের পর দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে তিনি দলের প্রধান তারকা, অধিনায়ক ও আক্রমণের প্রাণভোমরা ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিনালিসিমা, ২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকার মতো বড় শিরোপা জয় করেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তিনি আর্জেন্টিনাকে ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যান। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল নিয়ে, যা তাঁকে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এমন ঐতিহাসিক অবদানের কারণেই তাঁর জন্য আলাদা বিদায়ী সম্মান আয়োজনের দাবি উঠেছে।
এই বিদায়ী আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সঙ্গে মেসির সম্পর্ক। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে জাতীয় দলের হয়ে বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে একাধিকবার ব্যর্থ হওয়ায় মেসিকে কঠিন সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। এমনকি ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালের পর তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। পরে ফিরে এসে তিনি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল যুগের নেতৃত্ব দেন। বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার সাফল্যের মাধ্যমে সমর্থকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও নতুন মাত্রা পায়। তাই এবার অবসর ঘোষণার পর সমর্থকদের বড় একটি অংশ চাইছে, মেসি যেন শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সি পরে মাঠে নামেন এবং দর্শকদের সামনে দাঁড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন।
যদি শেষ পর্যন্ত মেসিকে কোনো বিদায়ী ম্যাচের জন্য আর্জেন্টিনা স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে সেটি হবে আবেগঘন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ম্যাচের আগে বা পরে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হতে পারে এবং সতীর্থ, কোচ ও সমর্থকদের কাছ থেকে বিদায় জানানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। মেসির জন্য এটি প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ফেরার সিদ্ধান্তের চেয়ে বরং একটি সম্মানসূচক উপস্থিতি হতে পারে। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁর শেষবারের মতো একই ড্রেসিংরুম ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত মেসি নিজে এমন কোনো ম্যাচে ফেরার ঘোষণা দেননি। ফলে সম্ভাব্য বিদায়ী ম্যাচ নিয়ে আলোচনাকে নিশ্চিত খবর এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থেকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
সবকিছু মিলিয়ে মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায় শেষ হলেও তাঁর বিদায় এখনো ফুটবলবিশ্বের অন্যতম আলোচিত বিষয়। ৩৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়িয়ে তিনি দেশের জার্সিতে রেখে গেছেন রেকর্ড, অসংখ্য স্মৃতি এবং একাধিক ঐতিহাসিক শিরোপা। এখন আর্জেন্টিনার সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হবে মেসিবিহীন নতুন যুগ শুরু করা, আর সমর্থকদের প্রত্যাশা—বিদায়টা যেন তাঁর প্রাপ্য মর্যাদায় হয়। আগামী আন্তর্জাতিক বিরতিতে যদি তাঁকে সত্যিই বিশেষভাবে ফিরিয়ে এনে সম্মান জানানো হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি ম্যাচ হবে না; বরং দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার ফুটবলকে প্রতিনিধিত্ব করা এক কিংবদন্তির প্রতি জাতীয় শ্রদ্ধার প্রকাশ হবে। তাই মেসির সম্ভাব্য বিদায়ী ম্যাচ ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার চূড়ান্ত উত্তর এখন নির্ভর করছে মেসি, কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সিদ্ধান্তের ওপর।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!