ব্যবসার ধারণা আছে, কিন্তু পুঁজি নেই—এমন তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘উদ্যোগ (UDYOG): উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’র আওতায় নির্বাচিত উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন পাবেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট এ কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করে। এসএমইএসপিডি সার্কুলার নম্বর-০৫-এর মাধ্যমে জারি করা নীতিমালাটি দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা খুঁজে বের করা, তাদের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন দেওয়া এবং ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তা করাই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কারিগরি স্টার্টআপ, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও হস্তশিল্পসহ যেকোনো বৈধ ব্যবসায়িক উদ্যোগ এ কর্মসূচির আওতায় আসতে পারবে। নতুন কোনো উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণার পাশাপাশি ইতিমধ্যে পরিচালিত বৈধ ব্যবসাও অর্থায়নের জন্য বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-কমার্স, ফিনটেক, এডটেক, এগ্রিটেক ও হেলথটেকের মতো খাতেও তরুণদের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
তবে এ সুবিধা পেতে নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হবে। আবেদন জমা দেওয়ার শেষ তারিখে আবেদনকারীর বয়স সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে এবং তাঁকে প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিক হতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
ঋণখেলাপিরা এ কর্মসূচির আওতায় আবেদন করতে পারবেন না। আবেদনকারীর ঋণখেলাপির তথ্য ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো বা সিআইবি প্রতিবেদনে পাওয়া গেলে আবেদন বাতিল হবে। সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরাও এ সুবিধার জন্য যোগ্য হবেন না। একইভাবে আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসায়িক ঋণ নেওয়া ব্যক্তিদের জন্যও এই কর্মসূচিতে আবেদন করার সুযোগ নেই।
নীতিমালা অনুযায়ী, উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক চাহিদা ও সম্ভাব্য খরচ বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্লেন্ডেড অর্থায়ন দেওয়া হবে। এর ৫০ শতাংশ থাকবে ঋণ এবং বাকি ৫০ শতাংশ ম্যাচিং গ্র্যান্ট বা অনুদান হিসেবে। যেমন, কোনো উদ্যোগে ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন হলে ৬ লাখ টাকা ঋণ এবং ৬ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হবে। দুই অংশের অর্থই একই সময়ে উদ্যোক্তার ব্যাংক হিসাবে জমা হবে।
তবে ঋণের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে কিংবা বরাদ্দ করা অর্থের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে অনুদানের অংশও সুদমুক্ত ঋণে পরিণত হবে। পরে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ওই অর্থ আদায় করা হবে।
কর্মসূচিটি বাস্তবায়নে প্রতিটি উপজেলায় একটি করে ‘লিড ব্যাংক’ নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশের যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখা থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ করা যাবে। আবেদন গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট উপজেলা লিড ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদনগুলো যাচাই ও পরবর্তী ধাপে পাঠানো হবে। এরপর জেলা লিড ব্যাংকের মাধ্যমে সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পৌঁছাবে।
চূড়ান্তভাবে উদ্যোক্তা বাছাইয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, তফসিলি ব্যাংকের প্রতিনিধি, সফল উদ্যোক্তা, শিল্প খাতের প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে প্যানেল গঠন করা হবে। এই প্যানেল আবেদনকারীর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বাজারের সম্ভাবনা এবং কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতা মূল্যায়ন করবে। বাছাই শেষে মনোনীত উদ্যোক্তাদের ১৭ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কর্মসূচিটির প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের আট বিভাগের আট জেলা—মানিকগঞ্জ, ফেনী, নওগাঁ, ঝিনাইদহ, ভোলা, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নেত্রকোনার ৬৪টি উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
শুধু অর্থায়নের মধ্যেই কর্মসূচিটি সীমাবদ্ধ থাকছে না। অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং, বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরি এবং ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যবসা নিবন্ধনের মতো প্রয়োজনীয় বিষয়ে সহায়তা করবে। ফলে নতুন উদ্যোক্তারা ব্যবসা শুরু করার পাশাপাশি সেটিকে টেকসইভাবে পরিচালনার জন্যও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে উপজেলা পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি তরুণদের কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!