সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ও মূল টাকা পেতে ভুল ব্যাংক হিসাব নম্বরের কারণে বিনিয়োগকারীদের যে ভোগান্তিতে পড়তে হতো, তা কমাতে নতুন ব্যবস্থা চালু করছে সরকার। আজ মঙ্গলবার থেকে জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের অনলাইন ব্যবস্থায় চালু হচ্ছে স্বয়ংক্রিয় ব্যাংক হিসাব যাচাই ব্যবস্থা বা অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশন সিস্টেম (এভিএস)।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গতকাল সোমবার জানিয়েছে, ‘স্ট্রেনদেনিং পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম টু এনাবল সার্ভিস ডেলিভারি’ (এসপিএফএমএস) কর্মসূচির আওতায় এ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট তফসিলি ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে এটি কার্যকর হবে।

নতুন ব্যবস্থায় সঞ্চয়পত্র বা বন্ড কেনার সময় গ্রাহক যে ব্যাংক হিসাব নম্বর দেবেন, সেটি তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা হবে। আগে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও মুঠোফোন নম্বর যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকলেও ব্যাংক হিসাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না। ফলে আবেদনকারী যে হিসাব নম্বর দিতেন, সেটিই সিস্টেমে সংরক্ষণ করা হতো।

হিসাব নম্বরের কোনো একটি সংখ্যা ভুল হলে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে পাঠানো মুনাফা বা মূল অর্থ ফেরত আসত। এরপর তথ্য সংশোধন করে আবার অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে হতো। এতে বিনিয়োগকারীর সময় ও ভোগান্তি বাড়ার পাশাপাশি ইস্যু অফিস, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাজও বেড়ে যেত।

ভুল হিসাব নম্বরের কারণে একজন বিনিয়োগকারীর প্রাপ্য অর্থ অন্য ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এভিএস না থাকায় এ পর্যন্ত কয়েক হাজার গ্রাহককে এমন সমস্যার কারণে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।

নতুন পদ্ধতিতে ব্যাংক হিসাব নম্বর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট তফসিলি ব্যাংকের মাধ্যমে সেটি যাচাই করা হবে। প্রথমে দেখা হবে হিসাব নম্বরটি সঠিক ও সচল কি না। এরপর এনআইডি বা পাসপোর্ট নম্বরের সঙ্গে হিসাবধারীর তথ্য মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা হবে। ফলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বা মূল টাকা পাঠানোর আগেই ভুল কিংবা অসামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

এভিএস শুধু নতুন সঞ্চয়পত্র বা বন্ড কেনার সময় নয়, পরবর্তী সময়েও ব্যবহার করা হবে। কোনো বিনিয়োগকারী ব্যাংক হিসাব পরিবর্তন বা সংশোধন করতে চাইলে নতুন হিসাবটিও একই প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিক যাচাই করা হবে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের আশা, এভিএস চালুর ফলে ভুল ব্যাংক হিসাব নম্বর ভুক্তির ঘটনা শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসবে। এতে ইএফটি ফেরত আসার ঝুঁকি কমার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীর ভোগান্তি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর অতিরিক্ত কাজও কমবে। গ্রাহকের প্রাপ্য অর্থ প্রকৃত হিসাবধারীর হিসাবে নিরাপদ ও নির্ভুলভাবে পাঠানো সহজ হবে।

বর্তমানে সরকারের ১১টি জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের মধ্যে ৯টির লেনদেন জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এই সিস্টেমে নিবন্ধিত একক গ্রাহকের সংখ্যা ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার ২২৪। প্রতিদিন গড়ে ১ লাখ ৭৫ হাজার ইএফটির মাধ্যমে মুনাফা ও মূল অর্থ পরিশোধ করা হয়। একই সময়ে গড়ে ৮ হাজার নতুন সঞ্চয়পত্র ইস্যু করা হয়। এত বিপুলসংখ্যক লেনদেনে ব্যাংক হিসাব যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু হওয়াকে ডিজিটাল সেবা আধুনিকীকরণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে অর্থ বিভাগ।

এদিকে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়লেও সরকারের জন্য এটি আগের মতো বড় ঋণের উৎস হিসেবে থাকছে না। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সরকার ৯২ হাজার ৫১৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে। একই সময়ে পুরোনো সঞ্চয়পত্রের মূল টাকা ফেরত দিয়েছে ৯২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। ফলে ওই অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৩৬ কোটি টাকা। যদিও বাজেটে প্রথমে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল, পরে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়।

কয়েক বছর আগেও সঞ্চয়পত্র সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের অন্যতম বড় উৎস ছিল। ২০২০–২১ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। এখন নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের বড় অংশই পুরোনো বিনিয়োগকারীদের মূল টাকা পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ও সরকারি সিকিউরিটিজের ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভর করছে।

তবে বিনিয়োগকারীদের কাছে সঞ্চয়পত্র এখনো আকর্ষণীয়। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগের জন্য সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বিনিয়োগের অঙ্ক অনুযায়ী মুনাফার হার ভিন্ন।

অর্থ বিভাগ মনে করছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বিত এভিএস চালুর ফলে সঞ্চয়পত্রের লেনদেন আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য হবে। বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক দৈনিক লেনদেনে ভুল কমিয়ে বিনিয়োগকারীর প্রাপ্য অর্থ দ্রুত ও সঠিক ব্যাংক হিসাবে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!