দেশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ সক্ষমতা ও নিরাপদ মজুতের সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার সময় সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২২ লাখ ১০ হাজার ৬৭০ টন। ছয় মাসের ব্যবধানে ৯ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৪ টনে। অর্থাৎ এ সময়ে মজুত বেড়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৮৪ টন।
বর্তমান মজুতের মধ্যে চাল রয়েছে ২০ লাখ ৩৬ হাজার ১০২ টন, গম ২ লাখ ৩২ হাজার ১৮৩ টন এবং ধান ৩৪ হাজার ৭০ টন। ফ্লোটিং মজুতসহ মোট খাদ্যশস্যের পরিমাণ ২৩ লাখ ৫৯ হাজার ১৫৪ টন। এর মধ্যে ফ্লোটিং মজুত হিসেবে রয়েছে ৬৮ হাজার ৭২৩ টন গম।
সরকারি তথ্য বলছে, খাদ্যশস্যের এই মজুত দেশের প্রচলিত নিরাপদ মজুতের সীমার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আগে দেশে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুত থাকাকে নিরাপদ সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই সীমা বাড়িয়ে ১৬ লাখ টন নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জুলাইয়ের সরকারি তথ্যেও ১৩ লাখ ৫০ হাজার টনের নিরাপদ সীমার তুলনায় খাদ্য মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকার কথা জানানো হয়েছিল।
শুধু মজুতের পরিমাণ নয়, সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণের সক্ষমতাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেন জানিয়েছেন, আগে সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণের সক্ষমতা ছিল প্রায় ২৪ লাখ টন। বর্তমানে তা বেড়ে ২৭ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে এই সক্ষমতা ৩৪ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে। একই লক্ষ্য নিয়ে জুলাইয়েও সরকারের পক্ষ থেকে ৩৪ লাখ টন ধারণক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল।
খাদ্যশস্যের মজুত বৃদ্ধির চিত্র গত কয়েক বছরের তুলনাতেও স্পষ্ট। ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট চাল ও গম মিলিয়ে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২১ লাখ ৩১ হাজার টন। সেই হিসাবে বর্তমান মজুত বেড়েছে ২ লাখ ২৮ হাজার ১৫৪ টন। আর ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় মজুত বেড়েছে প্রায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার টন। ২০২৪ সালে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ১৬ লাখ ৮৪ হাজার ৩৩০ টন।
এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বোরো সংগ্রহ কার্যক্রমেও অগ্রগতি হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধান ও চাল মিলিয়ে মোট ১৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৫ টন খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ধান ৫ লাখ ৭৮ হাজার ১৪০ টন, সিদ্ধ চাল ১২ লাখ ১ হাজার ৫৬৮ টন এবং আতপ চাল ১ লাখ ৫ হাজার ৩১৩ টন। পাশাপাশি ৫২৩ টন গম সংগ্রহ করা হয়েছে।
খাদ্যশস্যের সরবরাহ পরিস্থিতি শক্তিশালী রাখতে আমদানিও অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে মোট ৮ লাখ ২৭ হাজার ৭০০ টন খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে এসেছে ৬৫ হাজার ৮৬০ টন এবং বেসরকারি পর্যায়ে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৮৪০ টন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদন, সংগ্রহ, আমদানি ও সংরক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত চাল ও গমের মজুত থাকায় বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় খাদ্য বিতরণ অব্যাহত রাখার সক্ষমতা রয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংগ্রহ শাখার যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম চৌধুরী বাসসকে বলেন, চলতি মৌসুমে অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ অভিযান সফল ও সন্তোষজনকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। সরকারি গুদামে বর্তমানে চাল ও গমের পর্যাপ্ত ও নিরাপদ মজুত রয়েছে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) মহাপরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, জাতীয় চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাদ্যশস্যের মজুত ও সংরক্ষণ সক্ষমতা সমন্বয়ের কাজ চলছে। দেশে এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ায় আমনেও ভালো ফলনের আশা করছে সরকার। ফলে বোরোর মতো আমন সংগ্রহেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জনের প্রত্যাশা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে গমের পরিবর্তে চাল ব্যবহারের বিকল্প পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। তাঁর মতে, বর্তমান মজুত পরিস্থিতিতে খাদ্য নিয়ে সরকারের বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই।
খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জামাল হোসেন বলেন, সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও গুণগত মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে বোরো ধান ও চাল সংগ্রহের কাজও স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ওএমএস ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মতো সরকারি খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম সচল রাখতেও গুদাম থেকে সরবরাহ ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সরকারি গুদামগুলোর সামগ্রিক খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৪ লাখ টনে উন্নীত করা হলে ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারের অস্থিরতা বা আমদানি-সংক্রান্ত সংকট মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সূত্র: বাসস
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!