প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনতে নতুন পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের ছোট দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এলাকা ও বাজারভিত্তিক নির্দিষ্ট হারে মাসিক ভ্যাট বা কর নির্ধারণ করা হতে পারে। তবে এই হার এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসে ৫০০ টাকা, উপজেলা পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং জেলা সদর ও জেলা পৌর এলাকায় ২ হাজার টাকা হারে ভ্যাট নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ভ্যাট পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা করছে এনবিআর।
এনবিআর সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ের বাজার, বিপণিবিতান ও দোকানের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। কোথায় কতটি দোকান রয়েছে, দোকানের ধরন কী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি কোন এলাকায় অবস্থিত—এসব তথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন পরিসংখ্যানও সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে ইউনিয়ন পর্যায় থেকেও একই ধরনের তথ্য নেওয়া হবে।
সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হবে। এরপর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত হারের কর বা ভ্যাটের আওতায় আনা হবে, তা চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেশের ৩ থেকে ৫ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উপজেলা পর্যায়ের বাজার, বিপণিবিতান ও দোকানের তালিকা ইতোমধ্যে ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে আসতে শুরু করেছে। ইউনিয়ন পর্যায়েও তথ্য সংগ্রহ চলছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণের পর নির্ধারিত হারের পরিমাণ চূড়ান্ত করা হবে। প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট বা কর পরিশোধ সহজ করতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ কাজে আলাদা অ্যাপ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এনবিআরের সংগৃহীত একটি তালিকার উদাহরণ হিসেবে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নুর নাহার প্লাজায় ৫২টি দোকানের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চারটি দোকানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র রয়েছে। রংপুর সিটির বেতপট্টি বাজারে ১২১টি এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার রৌমারী বাজারে ৫০টি দোকানের তথ্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আকার ও ধরন সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হচ্ছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট হারে কর আরোপের এই পরিকল্পনার সঙ্গে প্রায় এক দশক আগের প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থার কিছুটা মিল রয়েছে। ওই ব্যবস্থায় শহরাঞ্চলের ছোট ব্যবসায়ীদের লেনদেনের পরিমাণ বিবেচনা না করে নির্দিষ্ট হারে মাসিক ভ্যাট দিতে হতো। ২০১৯ সালে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার পর প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এবার নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যায়ের ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অনেকটা নির্দিষ্ট হারের কাঠামো চালু হতে পারে।
তবে বর্তমান ভ্যাট কাঠামোর সঙ্গে প্রস্তাবিত ব্যবস্থার পার্থক্য রয়েছে। এনবিআরের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক টার্নওভার ৮০ লাখ টাকার বেশি হলে ভ্যাট নিবন্ধন প্রয়োজন এবং ৩০ লাখ টাকার বেশি থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের ক্ষেত্রে টার্নওভার করের বিধান রয়েছে। এনবিআরের ওয়েবসাইটে বর্তমানে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারকে টার্নওভার করের আওতার বাইরে এবং ৩০ লাখ ১ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ৩ শতাংশ টার্নওভার করের তথ্যও রয়েছে—অর্থাৎ বিভিন্ন সরকারি নির্দেশনায় সীমা ও কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে।
এ কারণে নতুন নির্ধারিত হারের ব্যবস্থা চালু হলে সেটি বিদ্যমান টার্নওভার কর ও ভ্যাট কাঠামোর সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা চূড়ান্ত নীতিমালা প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কর পরিশোধ সহজ করতে ব্যবসার ধরন, আর্থিক সক্ষমতা এবং এলাকা ও বাজারভিত্তিক নির্ধারিত হারে কর দেওয়ার নতুন ব্যবস্থা প্রস্তাব করা হয়েছিল।
এনবিআরের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেও কর ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং কর আদায়ের পরিধি বাড়ানো। একই সঙ্গে প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য প্রক্রিয়াটি সহজ ও হয়রানিমুক্ত রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট খাত থেকে ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে ভ্যাট ও কর ব্যবস্থার আওতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও নিয়মিত রাজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!