যৌথ মালিকানার খতিয়ানভুক্ত জমির ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ের ডিকেএমপি অনুবিভাগ থেকে জারি করা এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, যৌথ খতিয়ানের এক বা একাধিক মালিক বণ্টননামার ভিত্তিতে নামজারি করে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে পারবেন। বাংলাদেশ সচিবালয় থেকে জারি করা এই নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেছেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ।

পরিপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমানে যৌথ মালিকানার খতিয়ানের ক্ষেত্রে খতিয়ানের সম্পূর্ণ জমির ভূমি উন্নয়ন কর একসঙ্গে পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর ফলে হিস্যা অনুযায়ী খতিয়ানের এক বা একাধিক মালিকের জমির ভূমি উন্নয়ন কর অর্থাৎ খতিয়ানের আংশিক জমির কর পরিশোধের কোনো সুযোগ নেই। ভূমি উন্নয়ন কর আইন, ২০২৩-এর ৬(৩) ধারা অনুযায়ী, উত্তরাধিকারসূত্রে বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তরের ফলে জমির মালিকানা একাধিক ব্যক্তির উপর বর্তালে এবং তারা জমা-খারিজ করে পৃথক নামজারি না করিয়ে থাকলে, ওই জমি একই খতিয়ানভুক্ত গণ্য করে তার ভূমি উন্নয়ন কর নির্ধারণ করতে হবে। এই বিধানের কারণে খতিয়ানের সব মালিক একসঙ্গে কর পরিশোধে আগ্রহী না হলে খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত এক বা একাধিক মালিক তাদের মালিকানাধীন জমির কর পৃথকভাবে পরিশোধ করতে পারছেন না।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে যৌথ খতিয়ানের এক বা একাধিক মালিকের পক্ষে সম্পূর্ণ জমির ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করাও দুরূহ এবং তা যৌক্তিক বা সমীচীন নয়। ফলে যৌথ মালিকানার খতিয়ানের একজন মালিক তার হিস্যা অনুযায়ী মালিকানাধীন অংশ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বা অন্য কোনো প্রয়োজনে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান করতে পারছেন না এবং এতে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এই জটিলতা ও হয়রানি নিরসনে ভূমি মন্ত্রণালয় ছয় দফা নির্দেশনা দিয়েছে।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অনিবার্য কারণে যৌথ মালিকানার খতিয়ানের সম্পূর্ণ জমির ভূমি উন্নয়ন কর একসঙ্গে প্রদান সম্ভব না হলে কর প্রদান বা দাখিলা ছাড়াই রেজিস্ট্রার্ড বণ্টননামা দলিল অথবা আদালতের মাধ্যমে সম্পাদিত বণ্টননামার ভিত্তিতে নামজারি করা যাবে। অর্থাৎ বণ্টননামার ভিত্তিতে যৌথ খতিয়ানের এক বা একাধিক মালিক ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ ছাড়াই একক বা পৃথক খতিয়ান সৃজনের জন্য নামজারির আবেদন করতে পারবেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) মালিকানার সঠিকতা যাচাই সাপেক্ষে কর আদায় বা দাখিলা ছাড়াই এই নামজারির আবেদন মঞ্জুর করতে পারবেন।

তবে নতুন সৃষ্ট খতিয়ানের মালিকদের পূর্বতন যৌথ খতিয়ানের হিস্যা অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন করের বকেয়া প্রযোজ্য হারে এবং হালনাগাদ কর পরিশোধ করে দাখিলা গ্রহণ করতে হবে বলে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পরিপত্রে স্পষ্ট করা হয়েছে, যৌথ খতিয়ান থেকে বণ্টননামামূলে নামজারির মাধ্যমে পৃথক খতিয়ান সৃজন ব্যতীত কোনো মালিক এককভাবে তার অংশের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে পারবেন না। এই নির্দেশনা কার্যকর করার লক্ষ্যে অনলাইন ও অটোমেটেড ভূমিসেবা সিস্টেমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনয়ন বা নতুন মডিউল সংযোজনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিপত্রে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে এই নির্দেশনা জারি করা হলো এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে। মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনা ভূমি আপিল বোর্ড, ভূমি সংস্কার বোর্ড, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরসহ সব বিভাগীয় কমিশনার, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব এবং তিন পার্বত্য জেলা ব্যতীত দেশের সব জেলা প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কাছে পাঠানো হয়েছে।

ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমির ক্ষেত্রে যৌথ খতিয়ান তৈরি হওয়া একটি সাধারণ চিত্র বাংলাদেশে। পরিবারের সদস্যরা আলাদাভাবে নামজারি না করালে বছরের পর বছর একই খতিয়ানে একাধিক মালিকের নাম থেকে যায়। এমন পরিস্থিতিতে কোনো একজন মালিক তার অংশ বিক্রি বা হস্তান্তর করতে চাইলে পুরো খতিয়ানের কর পরিশোধ ছাড়া তা সম্ভব হচ্ছিল না, যা বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর ছিল না। নতুন এই নির্দেশনার ফলে যৌথ মালিকানার জমির মালিকরা নিজ নিজ অংশের জন্য পৃথকভাবে নামজারি ও কর পরিশোধের সুযোগ পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য দেশের সব ভূমি অফিসকে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা মেনে নামজারি ও কর আদায়ের প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি অনলাইন ভূমিসেবা প্ল্যাটফর্মেও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

 

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!