মন্ত্রিসভায় জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদনের পর ১১ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো গেজেট প্রকাশ হয়নি। ৩১ আগস্ট নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর এক সপ্তাহের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারির কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেটি প্রকাশ না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নবম জাতীয় পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পর্যায়ে রয়েছে। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের আগে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের আগ্রহের মূল জায়গা হলো প্রজ্ঞাপনে থাকা বিস্তারিত নির্দেশনা। নতুন স্কেলে মূল বেতন কত হবে, কোন ভাতা কখন থেকে কার্যকর হবে, বেতন সমন্বয়ের নিয়ম কী হবে এবং জুলাই থেকে প্রাপ্য বকেয়া কীভাবে হিসাব করা হবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে গেজেটের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। সেদিন মন্ত্রিপরিষদসচিব জানিয়েছিলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে। এর দুই দিন পরও জানানো হয়েছিল, অর্থ বিভাগ ওই দিন অথবা পরদিন বেতন কাঠামো নিয়ে আদেশ জারি করতে পারে এবং চলতি সপ্তাহের মধ্যেই গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, গেজেট প্রকাশের আগে প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এর মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংও রয়েছে। তবে গেজেট প্রকাশে বিলম্বের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বিস্তারিত কিছু বলছেন না। ফলে প্রজ্ঞাপন জারিতে দেরির প্রকৃত কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
অর্থ বিভাগের একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, জুডিশিয়ারি সার্ভিসের কর্মীরা শতভাগ ভাতা দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। তবে অর্থ বিভাগ এতে সম্মতি দেয়নি। বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ সমাধান ছাড়াই নতুন বেতন কাঠামো মন্ত্রিসভায় অনুমোদন ও ঘোষণা করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এখন ওই জটিলতার সমাধান ছাড়া গেজেট প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত খসড়া বা গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত বেতন নির্ধারণের সুযোগ নেই। কারণ বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধার বিষয়ে প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনাই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী, বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। বর্তমান কাঠামোর তুলনায় সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বলে জানানো হয়েছে।
নতুন পে স্কেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূল বেতন ও সংশ্লিষ্ট সুবিধাগুলো একসঙ্গে পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা। মন্ত্রিপরিষদসচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন জাতীয় বেতন স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হবে। তবে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এর বাস্তবায়ন পর্যায়ক্রমে করার কথা বলা হয়েছে।
এর ফলে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর এবং পরবর্তী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে নতুন পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব পড়বে। তবে ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হলেও গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় বকেয়া পাওনা নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে।
জুলাই থেকে নতুন বেতন ও সুবিধা কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মূল বেতন এবং বিভিন্ন ভাতা একই তারিখ থেকে কার্যকর হবে কি না, নাকি কোনো কোনো সুবিধা পরবর্তী সময়ে চালু হবে—প্রজ্ঞাপনে এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়ার কথা রয়েছে।
নতুন কাঠামোর আওতায় শুধু কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নয়, পেনশনভোগীদের সুবিধাও পুনর্বিন্যাসের কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পেনশনভোগীদের নিট পেনশনের ওপর নির্ধারিত শতাংশ অনুযায়ী সুবিধা বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান রয়েছে—এমন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রথমবারের মতো মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬’ অনুমোদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক স্কেল, এক বেতন’ বাস্তবায়নের লক্ষ্য জানিয়েছে সরকার।
তবে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, কোন সুবিধা কখন থেকে পাওয়া যাবে এবং জুলাই থেকে বকেয়া কীভাবে হিসাব করা হবে—তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে নবম জাতীয় পে স্কেলের গেজেট প্রকাশের পর। ফলে এখন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নজর রয়েছে বহুল প্রত্যাশিত সেই প্রজ্ঞাপনের দিকে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!