দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিন এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দিতে প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য থেকে জানা গেছে। একই সঙ্গে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে গড়ে ওঠা চার্জিং পয়েন্টের কারণে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বছরে এ খাতে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৩ হাজার ৩০০টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। ঢাকাতেই রয়েছে ৪৮ হাজারের বেশি এমন পয়েন্ট। এসব স্থানে অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করে ব্যাটারিচালিত যানবাহন চার্জ দেওয়ার ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার পাশাপাশি সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমানে দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়েছে। তুলনামূলক কম ভাড়া এবং সহজলভ্যতার কারণে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত এসব যান মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর চার্জিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে।
একটি ইজিবাইকে সাধারণত চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। একটি সেট ব্যাটারি চার্জ দিতে গড়ে ৮০০ থেকে ১১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। পুরো সেট চার্জ করতে দিনে বা রাতে অন্তত পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লাগে। এতে প্রতিটি গাড়ির ব্যাটারি চার্জে গড়ে ৫ থেকে ৬ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে।
বিপুলসংখ্যক যানবাহন একই সময়ে চার্জ দেওয়ার কারণে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে আবাসিক এলাকার সংযোগ ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে এসব যান চার্জ দেওয়া হলে ট্রান্সফরমার ও স্থানীয় বিদ্যুৎ লাইনে অতিরিক্ত লোড পড়ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহে সমস্যা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অবৈধ চার্জিংয়ের ধরনও বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন। অনেক চালক আবাসিক এলাকার বিদ্যুৎ লাইন, গ্যারেজের সংযোগ কিংবা সরাসরি অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ থেকে গাড়ির ব্যাটারি চার্জ করছেন। আবার ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় এক শ্রেণির ব্যক্তি আলাদা ঘর বা দোকান তৈরি করে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ নিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ব্যবসা চালাচ্ছেন। এসব স্থানে চালকদের কাছ থেকে সামান্য অর্থের বিনিময়ে গাড়ি চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি এসব যানবাহন নিয়ে পরিবেশ ও সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিস্তার শুধু বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে না, সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি করছে। একই সঙ্গে ব্যাটারির ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পরিবেশগত বিষয়ও জড়িত।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, শহর ও গ্রাম উভয় জায়গাতেই এসব যান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে অফ-পিক সময়ে ব্যাটারি চার্জের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি এসব যানকে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিং ব্যবস্থার আওতায় আনার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
তার মতে, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চার্জিংয়ের কারণে যাতে বিদ্যুতের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি। পরিকল্পিত চার্জিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে একই সঙ্গে বিদ্যুতের ওপর চাপ এবং অবৈধ সংযোগ ব্যবহারের প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে।
জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, তুলনামূলক কম ভাড়ার কারণে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক এখন অনেক মানুষের কাছে জনপ্রিয় বাহন। মূল শহরের পাশাপাশি শহরতলি ও গ্রামাঞ্চলেও এসব যান ব্যাপকভাবে চলাচল করছে। তবে তাদের বড় একটি অংশ কোথায় এবং কীভাবে চার্জ দেওয়া হচ্ছে, সেটিই এখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ এবং এর ফলে রাজস্ব ক্ষতির যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চার্জিং ব্যবস্থাকে একটি পরিকল্পিত কাঠামোর মধ্যে আনার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বৈধ সংযোগ, নির্দিষ্ট চার্জিং সময় এবং বিকল্প হিসেবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!