আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সেচকাজে ব্যবহৃত ডিজেলচালিত পানির পাম্প পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজউদ্দীন খানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ পরিকল্পনার কথা জানান।
তাজউদ্দীন খান জানতে চান, সেচকাজে ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের পরিবর্তে কৃষকদের বিনামূল্যে সৌরবিদ্যুৎ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কি না। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেসব এলাকায় ডিজেল ব্যবহার করে পানির পাম্প চালানো হয়, সেগুলোকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কৃষিতে সেচ ব্যবস্থায় প্রচলিত ডিজেলনির্ভরতা কমিয়ে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা সামনে এলো। এতে কৃষকদের সেচকাজে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে বলে সরকারের পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা ও জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে নেওয়ার কথা জানান। আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিকল্প উৎস সম্প্রসারণে সরকারের বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
সরকারের জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে অন্তত ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদকে সামনে রেখে এ খাতে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করেছে সরকার।
এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এ ছাড়া বায়ু, বর্জ্য, পানিবিদ্যুৎ, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও অ্যাগ্রিভোলটেইক্সের মতো অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে আরও ৪৫০ থেকে ৫৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রয়োজনীয় পণ্য যেমন সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের ওপর নির্দিষ্ট শর্তে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর অব্যাহতির ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসারেও নতুন প্রণোদনার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। গত ১ সেপ্টেম্বর ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তিনি জানান। পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ের ওপর ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম বিবেচনায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নেট মিটারিং নির্দেশিকা ২০২৫ অনুসরণ করে যেসব গ্রাহক আগামী বছর ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করবেন এবং নিজেদের ব্যবহারের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করবেন, তারা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গ্রিডে সরবরাহ করা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য পাবেন।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অবকাঠামো ও নীতিগত ভিত্তি তৈরিতে বিভিন্ন নির্দেশিকা ও নীতিমালা প্রণয়নের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প উন্নয়ন নির্দেশিকা ২০২৬, নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি নীতিমালা ২০২৫, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫, নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ এবং জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি ২০২৫ রয়েছে।
এ ছাড়া বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবসায়িক মডেল, অনশোর উইন্ড গাইডলাইন এবং কার্বন ক্রেডিট প্রক্রিয়াকরণবিষয়ক গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে বলেও সংসদকে জানান তিনি।
অন্য এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণে ব্যবহৃত ব্যাটারি নিয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুতের স্টোরেজে বর্তমানে লেড ও লিথিয়াম—দুই ধরনের ব্যাটারি ব্যবহৃত হচ্ছে। লিথিয়াম ব্যাটারিকে উৎসাহিত করতে চায় সরকার এবং দেশে এ ধরনের ব্যাটারি উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, লেড ব্যাটারিতে অ্যাসিড ব্যবহারের কারণে পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। তাই ভবিষ্যতে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় লিথিয়াম ব্যাটারি বাধ্যতামূলক করার বিষয়েও সরকারের চিন্তাভাবনা রয়েছে।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টায় অধিবেশন শুরু হয়। দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী প্রথম ৩০ মিনিট ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব। প্রধানমন্ত্রীর জন্য আটটি তারকা চিহ্নিত প্রশ্ন নির্ধারিত ছিল। এর মধ্যে তিনি তিনটি প্রশ্ন এবং সাতটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!