দেশের সাক্ষরতার হার বাড়াতে বড় ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোর, তরুণ এবং নিরক্ষর নারী-পুরুষকে মৌলিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক ও কর্মমুখী দক্ষতায় গড়ে তুলতে একাধিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২১ সালে এ হার ছিল ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশে। তবে ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে স্থির রয়েছে। ফলে এখনো দেশের প্রায় ২১ দশমিক ৯ শতাংশ বা চার কোটি মানুষ নিরক্ষর রয়েছেন।
শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য কর্মমুখী শিক্ষা
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে সাক্ষরতা বাড়ানোর বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সরকারের নতুন পরিকল্পনায় শুধু পড়তে ও লিখতে শেখানো নয়, শিক্ষার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে ‘অলটারনেটিভ লার্নিং অপরচুনিটি (এএলও)’ কার্যক্রমের আওতায় দেশের ৬৪ জেলার ৬৪টি নির্বাচিত উপজেলায় ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সি ১৯ হাজার ২০০ বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোরকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই কর্মসূচির আওতায় ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি আরও ১৯ হাজার ২০০ তরুণকে জীবিকায়ন দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এক লাখ কিশোর-কিশোরী পাবে দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতা
‘স্কিল ফোকাসড লিটারেসি ফর আউট অব স্কুল অ্যাডোলেসেন্ট (স্কিলফো)’ কার্যক্রমের মাধ্যমে তিন বছরে এক লাখ কিশোর-কিশোরীকে দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া চলতি অর্থবছরে বিশেষ কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপে ৫০ জেলায় আরও চার হাজার কিশোর-কিশোরীকে প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাপ্তবয়স্কদেরও আনা হচ্ছে কর্মসূচির আওতায়
সাক্ষরতা বৃদ্ধির এই পরিকল্পনায় প্রাপ্তবয়স্ক নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘অ্যাডাল্ট লিটারেসি অ্যান্ড ফাংশনাল অ্যাবিলিটি (আলফা) এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম’-এর আওতায় ৪০ জেলার ৪০টি উপজেলায় ৩৫ হাজার নারী-পুরুষকে ব্যবহারিক সাক্ষরতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সি ৪৫ লাখ নিরক্ষর নারী-পুরুষকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ধারাবাহিক কার্যক্রমের ওপর জোর
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে নিরক্ষরতা কমানোর ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ বড় বাধা। তাই শুধু আন্তর্জাতিক দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচি নয়, নিয়মিত ও কার্যকর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, নিরক্ষর ও বিদ্যালয়বহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। সাক্ষরতা কার্যক্রমকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর পরিচালক (পরিকল্পনা, মনিটরিং ও মূল্যায়ন) ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন, নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরজ্ঞান ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। ধাপে ধাপে দেশের সাক্ষরতার হার বাড়বে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সরকারের এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোরদের শিক্ষার আওতায় আনার পাশাপাশি নিরক্ষর তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের দক্ষতা উন্নয়ন সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে বড় অগ্রগতি হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!