উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনে দক্ষ মানবসম্পদের গুরুত্ব থাকলেও বাংলাদেশে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে নিরক্ষরতা। স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও দেশে সাক্ষরতার হার কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাড়ছে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছর ধরে দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে স্থির রয়েছে।
ফলে দেশের ২১ দশমিক ৯ শতাংশ বা প্রায় চার কোটি মানুষ এখনো নিরক্ষর। অর্থাৎ তারা পড়তে ও লিখতে পারেন না।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো—‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর উদ্যোগে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
সোমবার মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, দেশে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে এখনো বড় একটি অংশ শিক্ষার মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার সুযোগ থেকে বাইরে রয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে স্থির রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা বছর সাক্ষরতা কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও প্রচারণা হলেও নিরক্ষরতা দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, নিরক্ষর ও বিদ্যালয়বহির্ভূত জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে না। দারিদ্র্য, ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহও নিরক্ষরতা কমানোর পথে বড় বাধা।
তিনি বলেন, শুধু আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ঘিরে কর্মসূচি নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। সাক্ষরতা কার্যক্রমকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, মাঠপর্যায়ে নজরদারি এবং শিক্ষাকে কর্মদক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জনবল থাকলেও মাঠপর্যায়ে কার্যক্রমে গতি কম বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের সাক্ষরতার জন্য একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়। এতে অংশ নেয় ৬ হাজার ৮০৫ জন।
এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত প্রাক-বৃত্তিমূলক বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় ছিল ৪ হাজার ১৯৮ জন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত প্রকল্প ও কার্যক্রম না থাকায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে।
সরকার সাক্ষরতার পাশাপাশি বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোর ও নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে কর্মমুখী দক্ষতায় গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে।
এর আওতায় ‘অলটারনেটিভ লার্নিং অপরচুনিটি (এএলও)’ কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলার ৬৪টি নির্বাচিত উপজেলায় ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সি ১৯ হাজার ২০০ বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু-কিশোরকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি আরও ১৯ হাজার ২০০ তরুণকে জীবিকায়ন দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
‘স্কিল ফোকাসড লিটারেসি ফর আউট অব স্কুল অ্যাডোলেসেন্ট (স্কিলফো)’ কার্যক্রমের মাধ্যমে তিন বছরে এক লাখ কিশোর-কিশোরীকে দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
চলতি অর্থবছরে বিশেষ কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপে ৫০ জেলায় আরও ৪ হাজার কিশোর-কিশোরীকে প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
এ ছাড়া ‘অ্যাডাল্ট লিটারেসি অ্যান্ড ফাংশনাল অ্যাবিলিটি (আলফা) এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম’-এর আওতায় ৪০ জেলার ৪০টি উপজেলায় ৩৫ হাজার নারী-পুরুষকে ব্যবহারিক সাক্ষরতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তীতে ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সি ৪৫ লাখ নিরক্ষর নারী-পুরুষকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর পরিচালক (পরিকল্পনা, মনিটরিং ও মূল্যায়ন) ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন, নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরজ্ঞান ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। ধাপে ধাপে সাক্ষরতার হার বাড়বে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!