চলতি আমন মৌসুমের শুরুতেই লালমনিরহাটে সার সংকট নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়া এবং কোনো কোনো স্থানে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকরা। পরে সার সরবরাহ স্বাভাবিক করা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পেয়ে অবরোধ প্রত্যাহার করেন তারা।
রোববার সকালে লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর বাফা গোডাউনের সামনে লালমনিরহাট-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন স্থানীয় কৃষকরা। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং উভয় দিকে যানবাহনের জট তৈরি হয়। খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
এ সময় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সার সংকটের বিষয়টি শোনেন তারা। পরে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে সার সরবরাহ স্বাভাবিক করা, কৃত্রিম সংকট ও অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং কৃষকদের নির্ধারিত দামে সার দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলে বিক্ষুব্ধ কৃষকরা অবরোধ তুলে নেন।
কৃষকদের অভিযোগ, আমন মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার কিনতে গিয়ে তাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। ডিলারদের কাছে গেলে অনেক সময় ‘স্টক শেষ’ বলে জানানো হলেও বাড়তি টাকা দিতে রাজি হলে সার পাওয়া যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারায় ফলন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত মূল্যের টিএসপি সার প্রতি বস্তা ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও বিভিন্ন এলাকায় তা ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কোথাও কোথাও প্রতি বস্তায় ৪০০ থেকে ৮৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হলেও কৃষকদের ক্যাশ মেমো দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তারা।
কৃষক রেজাউল আলম বলেন, ডিলার ও ব্যবসায়ীদের কাছে সার চাইলে অনেক সময় নেই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু অতিরিক্ত টাকা দিতে রাজি হলে সেই সারই পাওয়া যায়। এভাবে সার কিনতে গিয়ে তাদের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাট জেলায় বিভিন্ন ধরনের সারের চাহিদার তুলনায় সরকারি বরাদ্দে ঘাটতি রয়েছে। জেলায় ইউরিয়া সারের চাহিদা ৬৮ হাজার ৯৩২ মেট্রিক টন হলেও বরাদ্দ পাওয়া গেছে ৩৯ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টন। একইভাবে ৩০ হাজার ২১০ মেট্রিক টন টিএসপি সারের চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ মিলেছে ১২ হাজার ৭০২ মেট্রিক টন। ডিএপি ও এমওপি সারেও চাহিদা ও বরাদ্দের মধ্যে ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে টিএসপি সারের সংকট বেশি বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
তবে বিএডিসির লালমনিরহাট গুদামের সহকারী পরিচালক একরামুল হক বলেন, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। নির্ধারিত ১৪৪ জন ডিলারের মাধ্যমে সরকারি নির্ধারিত দামেই সার সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয় ডিলাররাও অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের ভাষ্য, বরাদ্দ কম থাকায় কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়িয়ে সার বিক্রি করা হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন তারা।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অবৈধভাবে সার মজুত ঠেকাতে বাজার এবং ডিলার পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি কিংবা অবৈধ মজুতের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত ১০ আগস্ট একই ধরনের অভিযোগ ও দাবিতে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছিলেন কয়েক হাজার কৃষক। ফলে আমন মৌসুমে জেলার সার সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে কৃষকদের অসন্তোষ যে ক্রমেই বাড়ছে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের আশঙ্কা, আমন চাষের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, অন্যদিকে বাড়তে পারে কৃষকের খরচ। তাই দ্রুত চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ, ডিলার পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!