মৃত্যু এমন এক বাস্তবতা, যাকে কোনো মানুষ এড়িয়ে যেতে পারে না। পৃথিবীতে মানুষ যত পরিকল্পনাই করুক, একসময় তাকে সবকিছু পেছনে রেখে চলে যেতে হবে। অর্থ, সম্পদ, বাড়ি, ব্যবসা, পদমর্যাদা কিংবা প্রিয়জন—কিছুই তার সঙ্গে কবরে যাবে না। কোরআন ও হাদিসে মানুষের মৃত্যুর পরের আফসোসের এমন কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যা জীবিত অবস্থাতেই আমাদের নিজেদের জীবন নিয়ে ভাবতে শেখায়।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা এমন মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন, যার কাছে মৃত্যু এসে গেলে সে বলবে, “হে আমার রব! আমাকে আবার ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি যে কাজ রেখে এসেছি, তাতে সৎকর্ম করতে পারি।” কিন্তু তাকে আর পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। (সুরা আল-মুমিনুন: ৯৯-১০০)।
এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। মানুষ জীবিত অবস্থায় মনে করে, সামনে অনেক সময় পড়ে আছে। নামাজ পরে পড়ব, তাওবা পরে করব, দান পরে করব, বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালোভাবে সময় কাটাব, আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করব—এমন করে অনেক ভালো কাজ পিছিয়ে দিতে থাকে। কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্তে যখন আর ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না, তখন সেই পিছিয়ে দেওয়া কাজগুলোর জন্যই আফসোস হতে পারে।
সবচেয়ে বড় আফসোসগুলোর একটি হতে পারে আরও কিছু নেক আমল করার সুযোগ না পাওয়া। সুরা আল-মুনাফিকুনের ১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, মানুষের কারও মৃত্যু এসে যাওয়ার আগে আল্লাহ যে রিজিক দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করতে। নইলে সে বলবে, “হে আমার রব! আমাকে যদি আরও কিছু সময় অবকাশ দিতে, তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।”
এখানে বিশেষভাবে সদকার কথা এসেছে। জীবিত অবস্থায় অনেক মানুষ অর্থ জমাতে ব্যস্ত থাকেন। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং ভবিষ্যতের জন্য সম্পদ জমাতে গিয়ে দরিদ্র, অসহায় ও অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগগুলো হারিয়ে ফেলেন। অথচ মৃত্যুর সময় এসে মানুষ বুঝতে পারে, তার হাতে থাকা সম্পদ আর তার নিজের কাজে লাগবে না। তাই সামর্থ্য থাকা অবস্থায় আল্লাহর পথে ব্যয় করা এবং মানুষের উপকার করা গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্যুর পর আরেকটি বড় উপলব্ধি হতে পারে—যে সম্পদ নিয়ে সারা জীবন এত ব্যস্ত ছিলাম, সেটি আসলে আমার সঙ্গে গেল না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তিনটি জিনিস যায়—তার পরিবার, তার সম্পদ এবং তার আমল। এর মধ্যে পরিবার ও সম্পদ ফিরে আসে, আর তার সঙ্গে থেকে যায় শুধু আমল। (সহিহ মুসলিম: ২৯৬০)।
এই হাদিস মানুষের দুনিয়াবি ব্যস্ততার দিকে নতুন করে তাকাতে শেখায়। সম্পদ উপার্জন করা নিষিদ্ধ নয়; বরং হালাল উপার্জন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সম্পদ অর্জন যদি মানুষের নামাজ, পরিবার, নৈতিকতা ও আখিরাতের প্রস্তুতিকে গ্রাস করে ফেলে, তাহলে একসময় সেই সম্পদের প্রকৃত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
আরেকটি বিষয় নিয়ে মানুষ আফসোস করতে পারে—নামাজ ও আল্লাহর আনুগত্যে অবহেলা করা। জীবিত অবস্থায় মানুষ অনেক সময় নামাজকে দিনের কাজের তালিকায় এমন একটি বিষয় হিসেবে দেখে, যা ব্যস্ততার কারণে পরে করা যাবে। অথচ মৃত্যু কখন আসবে তা কেউ জানে না। নামাজ ফরজ হওয়ায় এটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। তাই “সময় হলে করব” মানসিকতার পরিবর্তে এখন থেকেই নামাজকে জীবনের অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
মানুষ তাওবা করতে দেরি করার জন্যও আফসোস করতে পারে। গুনাহ হয়ে গেলে অনেকে বলেন, “আরেকটু পরে তাওবা করব।” কিন্তু তাওবার জন্য ভবিষ্যৎ নিশ্চিত নয়। মানুষ জানে না তার জীবনে পরবর্তী এক ঘণ্টা বা এক দিন আছে কি না। তাই ভুল হয়ে গেলে দ্রুত আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
মৃত্যুর আগে মানুষ বাবা-মায়ের সঙ্গে আরও ভালো আচরণ করতে না পারার জন্যও অনুতপ্ত হতে পারে। জীবিত বাবা-মাকে সময় না দেওয়া, তাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করা কিংবা তাদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব না দেওয়া—এসবের মূল্য অনেক সময় মানুষ তাদের হারানোর পর বুঝতে পারে। তাই বাবা-মা জীবিত থাকলে তাদের সঙ্গে কোমল আচরণ করা, খোঁজ নেওয়া এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা করা উচিত।
একইভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করে রাখা নিয়েও আফসোস হতে পারে। সামান্য অভিমান, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, কথার ভুল বোঝাবুঝি কিংবা পুরোনো ঝগড়ার কারণে অনেক মানুষ বছরের পর বছর আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। কিন্তু মৃত্যুর পর সেই সম্পর্ক ঠিক করার সুযোগ আর থাকে না। তাই জীবিত থাকতেই ক্ষমা চাওয়া, ক্ষমা করা এবং সম্পর্ক জোড়ার চেষ্টা করা উত্তম।
মানুষ গিবত, অপবাদ ও অন্যকে কষ্ট দেওয়ার কথাগুলো নিয়েও আফসোস করতে পারে। মুখের একটি কথা কখনো কখনো অন্য মানুষের জীবনে গভীর ক্ষতি করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি পোস্ট, কমেন্ট বা মেসেজও কারও সম্মান নষ্ট করতে পারে। তাই কথা বলার আগে এবং কিছু প্রকাশ করার আগে ভাবা উচিত—এতে কারও হক নষ্ট হচ্ছে কি না।
এর পাশাপাশি মানুষ অন্যের হক আদায় না করার জন্যও আফসোস করতে পারে। কারও টাকা পাওনা থাকলে তা পরিশোধ করা, কারও আমানত ফেরত দেওয়া, কারও অধিকার নষ্ট করলে তা সংশোধন করার চেষ্টা করা—এসব জীবিত অবস্থাতেই করতে হয়। মৃত্যুর পর নিজের পক্ষ থেকে মানুষের হক মিটিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই কারও প্রতি অন্যায় করে থাকলে যত দ্রুত সম্ভব তা সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত।
আরেকটি বড় আফসোস হতে পারে সময় নষ্ট করা। অর্থ হারালে মানুষ আবার উপার্জন করতে পারে, কোনো বস্তু হারালে তা আবার কেনা যেতে পারে; কিন্তু চলে যাওয়া সময় আর ফিরে আসে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অর্থহীন বিনোদন, অনর্থক বিতর্ক, অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কিংবা শুধু দুনিয়াবি ব্যস্ততায় জীবন পার করে দিলে একসময় মানুষ বুঝতে পারে—অনেক মূল্যবান সময় এমন কাজে চলে গেছে, যার কোনো স্থায়ী উপকার নেই।
তবে ইসলামে দুনিয়ার কাজকর্মকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়নি। পরিবারকে দেখাশোনা করা, হালাল উপার্জন করা, ব্যবসা করা, জ্ঞান অর্জন করা কিংবা মানুষের উপকার করা—এসবও সঠিক নিয়ত ও বৈধ পদ্ধতিতে নেক আমলে পরিণত হতে পারে। সমস্যা তখনই, যখন দুনিয়ার কাজ মানুষকে তার স্রষ্টা ও আখিরাতের কথা ভুলিয়ে দেয়।
মৃত্যুর পর মানুষের জন্য যে বিষয়গুলো বাস্তবে কাজে আসবে, তার প্রতি হাদিসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয়ের সওয়াব চলতে থাকে—সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম: ১৬৩১)।
এ কারণে জীবিত অবস্থায় এমন কিছু কাজ করে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যার উপকার মৃত্যুর পরও চলতে পারে। যেমন উপকারী জ্ঞান শেখানো, মানুষের কল্যাণে কোনো স্থায়ী কাজ করা কিংবা সন্তানদের নেক ও সৎভাবে গড়ে তোলা। এগুলো মানুষের জন্য মৃত্যুর পরও সওয়াবের কারণ হতে পারে।
মৃত্যুর আগে মানুষ হয়তো আরও একটি বিষয় উপলব্ধি করবে—দুনিয়ার প্রশংসা ও মানুষের স্বীকৃতি আসলে স্থায়ী নয়। মানুষ কতজন তাকে চিনত, কত বড় পদে ছিল কিংবা কত সম্পদের মালিক ছিল—এসব একসময় পেছনে পড়ে থাকবে। তার সঙ্গে থাকবে তার আমল। তাই মানুষের প্রশংসা পাওয়ার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করাই একজন মুমিনের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কোরআন ও হাদিসের এসব শিক্ষা আমাদের ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং মৃত্যুর আগেই জীবনকে সংশোধন করার সুযোগ দেওয়ার জন্য। যে আফসোস মানুষ মৃত্যুর পরে করতে পারে, সেই আফসোসের অনেক কারণ এখনই দূর করা সম্ভব। নামাজ শুরু করা যায়, তাওবা করা যায়, বাবা-মায়ের কাছে ক্ষমা চাওয়া যায়, আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করা যায়, মানুষের পাওনা পরিশোধ করা যায়, সদকা করা যায় এবং আল্লাহর জন্য ভালো কাজ শুরু করা যায়।
তাই মৃত্যুর সময় এসে “আরেকটু সময় পেলে ভালো কাজ করতাম”—এই আফসোস করার অপেক্ষা না করে আজই শুরু করা উচিত। কারণ আমরা জানি না আমাদের জন্য কতটা সময় অবশিষ্ট আছে। মৃত্যু নিশ্চিত, কিন্তু তার সময় অনিশ্চিত।
আজকের শিক্ষা: মৃত্যুর আগে মানুষ সবচেয়ে বেশি আফসোস করতে পারে সেই ভালো কাজগুলোর জন্য, যেগুলো করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে পিছিয়ে দিয়েছিল। তাই তাওবা, নামাজ, সদকা, বাবা-মায়ের সেবা, মানুষের হক আদায় এবং নেক আমল—কোনোটিই “পরে করব” বলে ফেলে রাখবেন না। যে কাজটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আজ করা সম্ভব, সেটিই আজ করার চেষ্টা করুন।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!