দেশের নাগরিকদের জন্য চালু হতে যাচ্ছে একক ডিজিটাল পরিচয়পত্র বা ‘এক-আইডি’। জন্মের পর থেকেই একজন নাগরিককে স্থায়ী ও স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচয় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এই পরিচয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, একটি কার্ড তৈরি, মুদ্রণ, বিতরণ ও সরবরাহে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬৯ টাকা। তবে এই ৩৬৯ টাকা প্রতিজন নাগরিককে সরাসরি ফি হিসেবে দিতে হবে—এমন সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের প্রস্তাবিত ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ বা ডি-স্টার প্রকল্পের আওতায় এই এক-আইডি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে এবং বর্তমানে এটি অনুমোদন প্রক্রিয়ার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৮ কোটি নাগরিককে এই একক পরিচয় ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় মোট ২০ কোটি পলিকার্বোনেট চিপ কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৪৬ টাকা। এর সঙ্গে কার্ড বিতরণ ও সরবরাহের জন্য আরও ১ ডলার বা প্রায় ১২৩ টাকা ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে একটি কার্ডের সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৩৬৯ টাকা।
এখানেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৩৬৯ টাকা হলো প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী একটি কার্ড তৈরি থেকে নাগরিকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাব্য ব্যয়, নাগরিকের কাছ থেকে নেওয়া নির্ধারিত মূল্য নয়। অর্থাৎ সরকার কার্ডটি পেতে প্রত্যেক নাগরিকের কাছ থেকে ৩৬৯ টাকা নেবে—এমন তথ্য এখনো নেই। বরং পুরো প্রকল্পের অর্থায়ন কীভাবে হবে, সেটিই প্রস্তাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডি-স্টার প্রকল্পের মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে আসার কথা ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের অংশ রাখা হয়েছে কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণ, নাগরিকদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং কার্ড বিতরণের জন্য। এসব খাতে প্রস্তাবিত ব্যয় প্রায় ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত এক-আইডির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শুধু একটি পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য নয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, একজন নাগরিকের জন্মের পর থেকেই তার একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় থাকবে। পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের সময় একই পরিচয় ব্যবহার করা যাবে। ফলে জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য নাগরিক সেবার তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমানে একজন নাগরিককে বিভিন্ন সেবার জন্য জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও টিআইএনের মতো আলাদা পরিচয় বা নম্বর ব্যবহার করতে হয়। নতুন ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো এসব তথ্য ও সেবাকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি সেবার ব্যবস্থাও এই একক পরিচয়ের সঙ্গে সমন্বিত হতে পারে। তবে কোন কার্ড কখন কীভাবে প্রতিস্থাপিত বা একীভূত হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই উদ্যোগের সঙ্গে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ ধারণাটিও যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিচয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি সেবার পাশাপাশি ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার সঙ্গে ডিজিটাল ওয়ালেট যুক্ত করার ধারণাও সামনে এসেছে।
তবে নতুন এক-আইডি কার্ডে ঠিক কী ধরনের তথ্য থাকবে, কার্ড কীভাবে বিতরণ করা হবে, বর্তমান জাতীয় পরিচয়পত্রের ভবিষ্যৎ কী হবে এবং নাগরিকদের কাছ থেকে কোনো ফি নেওয়া হবে কি না—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই আপাতত ৩৬৯ টাকাকে নাগরিকের পরিশোধযোগ্য ফি না ধরে একটি কার্ড তৈরি, মুদ্রণ, বিতরণ ও সরবরাহের প্রস্তাবিত সরকারি ব্যয় হিসেবে দেখাই সঠিক।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!