সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে বাজারে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি বা মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, দীর্ঘ ১১ বছর সরকারি কর্মচারীদের বেতন সমন্বয় না হওয়ায় বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের বাস্তবতায় নতুন করে বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। তবে একবারে পুরো পে-স্কেল কার্যকর না করে ধাপে ধাপে আগামী বছরের জুলাইয়ের মধ্যে তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীতে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তাঁর মতে, ধাপে ধাপে বেতন কার্যকর করা হলে একসঙ্গে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত অর্থ মানুষের হাতে চলে আসবে না। ফলে নতুন পে-স্কেলকে কেন্দ্র করে বাজারে আকস্মিক চাহিদা বৃদ্ধি এবং এর কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।

মন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিন বেতন সমন্বয় না হওয়ায় তাদের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে। মূল্যস্ফীতির বর্তমান বাস্তবতায় সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন ছিল। তবে বেতন বাড়ানোর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে বাস্তবায়নের পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাজারে মূল্যস্ফীতি শুধু মানুষের আয় বাড়ার ওপর নির্ভর করে না। পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি, স্থানীয় উৎপাদন, আমদানির সুযোগ, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামের ওঠানামাও মূল্যস্ফীতির ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাও সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

ভোজ্যতেলের বাজার পরিস্থিতি নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের সয়াবিন তেলের বাজার প্রায় পুরোপুরিই আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারের এফওবি বা জাহাজে তোলার পর্যায়ের মূল্যের সঙ্গে জাহাজভাড়া, পণ্য খালাস, বিমা, রিফাইনারিতে প্রক্রিয়াকরণ এবং পরিবহনসহ বিভিন্ন খরচ যুক্ত হওয়ার পর স্থানীয় বাজারে তেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়।

তেলের দাম নির্ধারণের সময় শুধু আন্তর্জাতিক বাজারদর নয়, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সম্ভাব্য লোকসানের ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়া বা কমার সঙ্গে দেশের বাজারে তার প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবির মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৭৮ লাখ পরিবারকে ভর্তুকি মূল্যে বিভিন্ন নিত্যপণ্য দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি ওএমএস কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে কম দামে খাদ্যপণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

আমদানি পরিস্থিতিও সরকার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানান তিনি। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলা এবং সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে, যাতে বাজারে পণ্যের ঘাটতি তৈরি না হয়। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করছে সরকার।

এদিকে দেশের চামড়া শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য সংস্কার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এ খাতে সাভারে নতুন বিশ্বমানের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার বা সিইটিপি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বড় ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব ইটিপি ব্যবহারের আওতায় আনা এবং ছোট ট্যানারিগুলোকে কেন্দ্রীয় সিইটিপির মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

চামড়া শিল্পে শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পরিবেশগত ও উৎপাদন মানদণ্ড পূরণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ বা এলডব্লিউজি সনদ অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

শুধু কাঁচা চামড়া বা সাধারণ চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির পরিবর্তে উচ্চমূল্যের প্রক্রিয়াজাত চামড়াজাত পণ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে ‘বাংলাদেশ লেদার’ নামে শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরি এবং দেশের চামড়া শিল্প থেকে আরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

একদিকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো পরিবর্তন, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও শিল্প খাতের সংস্কার—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় বাজারে অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি তৈরি না করে কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন নিশ্চিত করাই হবে নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!