দেশের সব নাগরিককে জন্মের পর থেকেই একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত এই পরিচয়পত্রের নাম দেওয়া হয়েছে ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি বা ‘এক-আইডি’। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিশুর জন্মের পরই এই পরিচয় তৈরি করা হবে এবং পরবর্তী জীবনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা নিতে একই পরিচয় ব্যবহার করা যাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বয়স ও প্রয়োজনভেদে জন্মনিবন্ধন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, কর শনাক্তকরণ নম্বরসহ বিভিন্ন ধরনের পরিচয়পত্র ও নম্বর ব্যবহৃত হয়। প্রস্তাবিত এক-আইডি ব্যবস্থা চালু হলে একজন নাগরিকের বিভিন্ন সরকারি সেবার তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ফলে একই তথ্য বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে বারবার দেওয়ার প্রয়োজন কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন এই ব্যবস্থা চালুর জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ বা ডি-স্টার নামে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলকে। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বর্তমানে এটি অনুমোদনের প্রক্রিয়ার জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৮ কোটি নাগরিককে বিবেচনায় নিয়ে পরিচয়পত্র তৈরির পরিকল্পনা করা হলেও কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণ করা হবে ২০ কোটি। এতে ভবিষ্যতে নতুন জন্ম নেওয়া নাগরিকসহ অতিরিক্ত প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ থাকবে। কার্ড হিসেবে পলিকার্বোনেট চিপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ মার্কিন ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ২৪৬ টাকা। এর সঙ্গে প্রতিটি কার্ডের বিতরণ ও সরবরাহ বাবদ আরও ১ ডলার বা প্রায় ১২৩ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদন, মুদ্রণ, বিতরণ ও সরবরাহ মিলিয়ে একটি কার্ডের আনুমানিক খরচ দাঁড়াচ্ছে ৩৬৯ টাকা।
পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের অংশ যাবে কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণ, নাগরিকদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ এবং কার্ড বিতরণের কাজে। এসব খাতে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
নতুন পরিচয়পত্রের ধারণাটিকে তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ একজন নাগরিকের জন্য একটি পরিচয় থাকবে, যা ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রেও ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে কার্ডে ঠিক কোন কোন ব্যক্তিগত ও নাগরিক তথ্য থাকবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সরকারের পরিকল্পনায় বিদ্যমান বিভিন্ন পরিচয়পত্রের সেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনার বিষয়টিও রয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, এক-আইডি ব্যবস্থা কার্যকর হলে ধীরে ধীরে জাতীয় পরিচয়পত্র, ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ডের মতো আলাদা কার্ডের প্রয়োজন কমতে পারে। তবে কোন কার্ডের কোন সেবা কীভাবে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে, তা এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি।
বর্তমান ব্যবস্থায় একজন নাগরিকের তথ্য একাধিক সরকারি ডেটাবেজে আলাদাভাবে সংরক্ষিত থাকে। জন্মনিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও টিআইএনসহ বিভিন্ন পরিচয় ব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর আন্তসংযোগ তৈরি করা গেলে একই ব্যক্তির তথ্য বারবার সংগ্রহের প্রয়োজন কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকের সময় ও ভোগান্তি কমতে পারে।
তবে এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক চাপের সময়ে প্রায় ৯ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের একাংশ মনে করছেন, বিদ্যমান এনআইডি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে এবং জন্মনিবন্ধনসহ অন্যান্য সরকারি তথ্যভান্ডারের মধ্যে আন্তসংযোগ তৈরি করেই একই ধরনের সুবিধা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেনের মতে, জাতীয় পরিচয়পত্রকে একক পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে এবং ১৮ বছরের কম বয়সী নাগরিকদেরও সেই ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব। ফলে সম্পূর্ণ নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে একই লক্ষ্য অর্জন করা যায় কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সরকারের পরিকল্পনার সঙ্গে ভবিষ্যতের ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, কৃষক কার্ড ও প্রবাসী কার্ডের মতো বিভিন্ন উদ্যোগের সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই নাগরিকের জন্য একাধিক আলাদা কার্ড চালু হলে যে তথ্যের পুনরাবৃত্তি ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে, এক-আইডি ব্যবস্থা তার সমাধান দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এক-আইডি প্রকল্প এখনো প্রস্তাবিত পর্যায়ে রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের যাচাই, অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত কাঠামো, তথ্যের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়গুলো চূড়ান্ত হওয়ার পরই প্রকল্পটির বাস্তব রূপ নির্ধারিত হবে। অনুমোদন পেলে এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জন্মের পর থেকে একজন নাগরিকের জন্য একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় তৈরির নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
তথ্যসূত্র: তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!