সন্তানকে নিয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্নের শেষ নেই। সন্তান যেন নেককার হয়, আল্লাহভীরু হয়, নামাজি হয়, ভালো মানুষ হিসেবে বড় হয়, জীবনে সফল হয় এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ করে—এটাই অধিকাংশ বাবা-মায়ের প্রত্যাশা। কিন্তু সন্তানকে শুধু ভালো শিক্ষা দিলেই সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সন্তানের অন্তর, ভবিষ্যৎ ও হেদায়েত আল্লাহর হাতে। তাই সন্তানের জন্য নিয়মিত দোয়া করা একজন মুসলিম বাবা-মায়ের গুরুত্বপূর্ণ আমল।
সন্তানের জন্য কোরআনে সরাসরি বর্ণিত দোয়াগুলোর মধ্যে অন্যতম সুন্দর একটি দোয়া হলো সুরা আল-ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতের দোয়া। এতে আল্লাহর নেক বান্দারা তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানদের চোখের শীতলতা এবং মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ হওয়ার প্রার্থনা করেন।
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
বাংলা উচ্চারণ: রব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ‘ইউনিওঁ, ওয়াজ‘আলনা লিলমুত্তাকীনা ইমামা।
অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ করুন।
এই দোয়াটি শুধু সন্তান যেন সফল হয়—এমন আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং সন্তান যেন বাবা-মায়ের জন্য “চোখের শীতলতা” হয় এবং আল্লাহভীরু জীবনের অংশীদার হয়—সেই প্রার্থনা। তাই সন্তানের দুনিয়াবি সাফল্যের পাশাপাশি তার ঈমান, চরিত্র ও আখিরাতের কল্যাণের জন্যও এই দোয়া করা অত্যন্ত সুন্দর।
সন্তানের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কোরআনি দোয়া করেছেন হজরত জাকারিয়া (আ.)। তিনি আল্লাহর কাছে নেক সন্তান চেয়ে বলেছিলেন—
رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ
বাংলা উচ্চারণ: রব্বি হাব লি মিল্লাদুনকা জুররিয়্যাতান তইয়্যিবাতান, ইন্নাকা সামীউদ দু‘আ।
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে আপনার পক্ষ থেকে নেক সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি দোয়া শ্রবণকারী। (সুরা আলে ইমরান: ৩৮)।
এটি বিশেষভাবে সন্তান লাভের জন্য কোরআনে বর্ণিত দোয়া হলেও সন্তান পাওয়ার পরও বাবা-মা সন্তানের নেককার হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারেন। কারণ সন্তানের সংখ্যা বা জন্মই মূল বিষয় নয়; তার নেককার হওয়াই বড় নিয়ামত।
সন্তানের জন্য দোয়ার পাশাপাশি নিজেদের আমল ও পারিবারিক পরিবেশের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে এসেছে, প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে এবং তার পরবর্তী পরিবেশ তার ওপর প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ সন্তানকে শুধু মুখে উপদেশ দিলেই হবে না; বাবা-মায়ের নিজেদের আচরণও সন্তানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
বাবা নামাজ পড়েন না অথচ সন্তানকে নামাজের জন্য চাপ দেন, মা সন্তানের সামনে অন্যের গিবত করেন অথচ সন্তানকে গিবত থেকে বারণ করেন—এভাবে শুধু উপদেশ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত চরিত্র গড়ে তোলা কঠিন। সন্তান বাবা-মায়ের কথা যেমন শোনে, তেমনি তাঁদের আচরণও অনুসরণ করে। তাই সন্তানের জন্য দোয়ার পাশাপাশি নিজেদের জীবনকেও সংশোধন করা জরুরি।
সন্তানের নামাজ ও ঈমানের জন্য দোয়া করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনে হজরত ইবরাহিম (আ.) নিজের ও তাঁর বংশধরদের নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন—
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
বাংলা উচ্চারণ: রব্বিজ‘আলনি মুকীমাস সালাতি ওয়া মিন জুররিয়্যাতি, রব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দু‘আ।
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী করুন এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের রব! আমার দোয়া কবুল করুন।
এই দোয়াটি সুরা ইবরাহিমের ৪০ নম্বর আয়াতে রয়েছে। সন্তানকে নিয়ে বাবা-মায়ের দোয়ার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত অর্থবহ—কারণ এখানে শুধু সন্তানের দুনিয়াবি সফলতা নয়, আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্কের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে।
সন্তানের হেদায়েতের জন্য দোয়া করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে নানা ধরনের পরিবেশ, বন্ধু, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ধরনের চিন্তাধারা আসে। বাবা-মা সব সময় সন্তানের পাশে থাকতে পারবেন না। তাই সন্তানের অন্তরকে আল্লাহর আনুগত্যে স্থির রাখার জন্য নিয়মিত দোয়া করা উচিত।
তবে শুধু দোয়া করলেই বাবা-মায়ের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নামাজ, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, শালীনতা, মানুষের প্রতি সম্মান এবং আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসার শিক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে সন্তানকে ভালোবাসা, সময় দেওয়া এবং তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনাও জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। সহিহ মুসলিমে আনাস (রা.)-এর বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তান ইবরাহিমকে চুম্বন ও স্নেহ করার ঘটনা এসেছে। এতে বোঝা যায়, ইসলামে সন্তান পালনের ক্ষেত্রে ভালোবাসা ও মমতারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সন্তানের জন্য দোয়া করার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—সন্তানের জন্য শুধু অর্থ, চাকরি, বাড়ি, গাড়ি বা পরীক্ষায় ভালো ফল চাওয়াই যথেষ্ট নয়। বরং দোয়ায় চাইতে হবে ঈমান, তাকওয়া, উত্তম চরিত্র, হালাল রিজিক, সৎ সঙ্গ, নামাজের প্রতি ভালোবাসা, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার শক্তি এবং আখিরাতের সফলতা।
একজন বাবা-মা সন্তানের জন্য নিজের ভাষাতেও দোয়া করতে পারেন। যেমন—“হে আল্লাহ, আমার সন্তানকে নেককার বানিয়ে দিন, তাকে ঈমানের ওপর অটল রাখুন, হারাম ও গুনাহ থেকে রক্ষা করুন, তাকে উত্তম চরিত্র দান করুন, হালাল রিজিক দিন এবং দুনিয়া ও আখিরাতে সফল করুন।” নিজের ভাষায় এমন দোয়া করা বৈধ ও অর্থবহ।
সন্তানের জন্য দোয়া করার ক্ষেত্রে সিজদা, রাতের শেষভাগ এবং দোয়া কবুলের অন্যান্য মর্যাদাপূর্ণ সময়গুলো কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশেষ করে বাবা-মা যখন সন্তানের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর কাছে তার ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করেন, তখন নিজের অন্তরের কথাগুলো আল্লাহর কাছে তুলে ধরা যায়। তবে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে সন্তানের জন্য দোয়া করলেই নিশ্চিতভাবে নির্দিষ্ট ফল পাওয়া যাবে—এমন দাবি করা ঠিক নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সন্তানের ভুলের সময় বদদোয়া না করা। রাগের মুহূর্তে অনেক বাবা-মা সন্তানকে অভিশাপ বা খারাপ কথা বলে ফেলেন। একজন মুসলমানের উচিত এমন কথা থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং সন্তানের সংশোধনের জন্য দোয়া করা। রাগের পরিবর্তে ভালোবাসা, শিক্ষা ও ধৈর্যের মাধ্যমে তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা উচিত।
সন্তানের জন্য দোয়ার পাশাপাশি বাবা-মায়ের নিজেদের নেক আমলও গুরুত্বপূর্ণ। নামাজের সময় সন্তানকে পাশে রাখা, কোরআন পড়ার পরিবেশ তৈরি করা, ঘরে অশ্লীলতা ও গুনাহের পরিবেশ কমানো এবং হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা—এসব সন্তানের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, “সবচেয়ে শক্তিশালী দোয়া” বলে কোরআন-হাদিসে একটি মাত্র দোয়াকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। বরং সন্তানের জন্য কোরআনে বর্ণিত একাধিক সুন্দর দোয়া রয়েছে। এর মধ্যে সুরা আল-ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতের দোয়াটি সন্তানের নেককার হওয়া, বাবা-মায়ের চোখের শীতলতা হওয়া এবং মুত্তাকিদের আদর্শ হওয়ার জন্য অত্যন্ত সুন্দর একটি দোয়া। এর পাশাপাশি হজরত জাকারিয়া (আ.)-এর নেক সন্তান লাভের দোয়া এবং হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সন্তানদের নামাজ প্রতিষ্ঠার দোয়াও পড়া যেতে পারে।
আজকের শিক্ষা: সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শুধু চিন্তা না করে প্রতিদিন তার জন্য দোয়া করুন। সন্তানের দুনিয়াবি সফলতার পাশাপাশি ঈমান, নামাজ, নেক চরিত্র ও আখিরাতের সফলতা চাইুন। আর মনে রাখুন—সন্তানের জন্য সবচেয়ে সুন্দর দোয়ার সঙ্গে বাবা-মায়ের নিজের ভালো আমল ও সুন্দর আচরণও জরুরি।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!