বাংলাদেশ ‘এ’ দলের অধিনায়ক তাওহীদ হৃদয় দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের বিপক্ষে এক ঐতিহাসিক ইনিংস উপহার দিয়েছেন। ২৪ বছর বয়সী এই ডানহাতি মিডল অর্ডার ব্যাটার চার দিনের অনানুষ্ঠানিক টেস্ট ম্যাচে অপরাজিত ৩০০ রানের ইনিংস খেলে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ তুলে নিয়েছেন। ৪৫০ বল মোকাবিলা করে তিনি এই মাইলফলক স্পর্শ করেন, যেখানে ছিল ২৫টি চার ও ৬টি ছক্কা, স্ট্রাইক রেট ৬৬.৬৭।

ম্যাচটি হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমের এনডব্লিউসি ওভালে, বাংলাদেশ ‘এ’ দলের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের দ্বিতীয় চারদিনের ম্যাচ হিসেবে। এই মাঠটি হৃদয়ের জন্য বিশেষ আবেগের জায়গা—২০২০ সালে এই ভেন্যুতেই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল ভারতকে হারিয়ে যুব বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছিল, এবং হৃদয় সেই চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য ছিলেন। ছয় বছর পর একই মাঠে ফিরে তিনি নতুন এক ইতিহাস রচনা করলেন। তৃতীয় দিনের খেলা শেষে হৃদয় ২০৪ রানে অপরাজিত ছিলেন, যা ছিল তার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরি। চতুর্থ তথা শেষ দিনে তিনি সেই ইনিংসকে টেনে নিয়ে যান তিন অঙ্কের বিরল মাইলফলক পর্যন্ত।

ম্যাচের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এই ইনিংসের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথম ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দল ৫১২ রানের বিশাল সংগ্রহ গড়েছিল। জবাবে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ মাত্র ১৩৫ রানেই শীর্ষ চার ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যায়। ঠিক এমন কঠিন পরিস্থিতি থেকে দলকে টেনে তোলার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন অধিনায়ক হৃদয়। শুরুতে জাকের আলী অনিকের সঙ্গে গড়েন ১৫১ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি, যেখানে জাকের মাত্র ৬ রানের জন্য নিজের সেঞ্চুরি মিস করে ৯৪ রানে আউট হন। এরপর মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের সঙ্গে যোগ করেন আরও ১৮৫ রান; সাইফউদ্দিন ৮৭ রানে ফিরে গেলেও হৃদয় একাই লড়াই চালিয়ে যান এবং প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে আধিপত্য বজায় রাখেন। এই ইনিংস কেবল দলকে নিশ্চিত পরাজয়ের শঙ্কা থেকে বাঁচায়নি, বরং জাতীয় নির্বাচকদের কাছে তার টেস্ট ক্রিকেটের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।

হৃদয়ের এই ইনিংস গড়ে ওঠে ধৈর্য ও আক্রমণাত্মকতার এক দুর্দান্ত মিশ্রণে। তৃতীয় দিন সকালে ৭৫ রানে অপরাজিত অবস্থা থেকে খেলা শুরু করে তিনি ৩৩৫ বলে ২২টি চার ও ১টি ছক্কার সাহায্যে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি মুশফিকুর রহিম, সাকিব আল হাসান ও শাহরিয়ার হোসেনের পর বিদেশের মাটিতে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ডাবল সেঞ্চুরি করা বাংলাদেশি ব্যাটারদের তালিকায় যুক্ত হন। এরপর দিন গড়াতে গড়াতে তিনি ইনিংসকে আরও বড় করে তোলেন, শেষ পর্যন্ত ৪৫০ বলে ৩০০ রানে পৌঁছে যান ২৫টি চার ও ৬টি ছক্কার মারে। দীর্ঘ সময় ক্রিজে টিকে থেকে তিনি একের পর এক মাইলফলক অতিক্রম করেছেন, যা তার শারীরিক সহনশীলতা ও মানসিক দৃঢ়তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জাতীয় দলের হয়ে সাদা বলের ক্রিকেটে নিয়মিত মুখ হলেও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে হৃদয়ের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম ছিল। এই ইনিংসের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করলেন যে লাল বলের ক্রিকেটেও দীর্ঘ ইনিংস খেলার সামর্থ্য তার রয়েছে। দলের জন্য কঠিন মুহূর্তে অধিনায়কের দায়িত্ব নিয়ে এমন একটি ইনিংস খেলা তার নেতৃত্বগুণেরও প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে তাওহীদ হৃদয়ের এই ইনিংস শুধু একটি ব্যক্তিগত মাইলফলক নয়—এটি বাংলাদেশ ‘এ’ দলকে কঠিন এক ম্যাচে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের প্রতীক, এবং একইসঙ্গে তার ব্যাটিং সামর্থ্যের এক শক্তিশালী প্রমাণ, যা ভবিষ্যতে তার টেস্ট ক্যারিয়ারের দুয়ার খুলে দিতে পারে। বাংলাদেশের ঘরোয়া ও ‘এ’ দল পর্যায়ের ক্রিকেটে এমন বড় ইনিংস বিরল, তাই এই কীর্তি দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!