বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ভিডিও স্ট্রিমিং, অনলাইন শিক্ষা, ক্লাউড সেবা, ডিজিটাল লেনদেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্যের নানা কার্যক্রম এখন ইন্টারনেটনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ দ্রুত নিশ্চিত করা না গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বড় ধরনের ব্যান্ডউইথ সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
সোমবার (৩১ আগস্ট) ‘ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ চাহিদা পূরণে নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় এ আশঙ্কার কথা উঠে আসে। টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ওই কর্মশালায় দেশের ভবিষ্যৎ ইন্টারনেট চাহিদা, সাবমেরিন ক্যাবল অবকাঠামো, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিয়ে আলোচনা করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার ছিল মাত্র ৫০ গিগাবিট প্রতি সেকেন্ড (জিবিপিএস)। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৭৬ টেরাবিট, ২০২০ সালে ১ দশমিক ৭৮ টেরাবিট, ২০২২ সালে ৪ দশমিক ২ টেরাবিট এবং ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৮৬ টেরাবিটে। ২০২৬ সালে এসে এই ব্যবহার প্রায় ১৩ দশমিক ৫ টেরাবিটে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র ১৩ বছরে দেশের আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ২৬০ গুণ।
চাহিদা বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সালে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ১৯ দশমিক ১ টেরাবিট। ২০২৮ সালে তা বেড়ে প্রায় ২৭ টেরাবিটে পৌঁছাতে পারে। এরপর ২০৩০ সালে ৫৪ টেরাবিট, ২০৩৫ সালে ৩০৫ টেরাবিট এবং ২০৩৬ সালে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা ৪৩২ টেরাবিটে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভিডিও স্ট্রিমিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার, এআই, অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং শিল্প খাতে দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের কারণে এই চাহিদা আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগের অন্যতম প্রধান ভিত্তি সরকারি মালিকানাধীন দুটি সাবমেরিন ক্যাবল—SEA-ME-WE-4 ও SEA-ME-WE-5। এগুলোর সক্ষমতা যথাক্রমে প্রায় ৪ দশমিক ৬ টেরাবিট ও ২ দশমিক ৫ টেরাবিট। এর বাইরে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক টেরেস্ট্রিয়াল ক্যাবল বা আইটিসি অপারেটরদের মাধ্যমে আমদানি করা হয়।
খাতসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ বাংলাদেশের তুলনামূলক কম সংখ্যক আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবল সংযোগ। কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে ১৯টি, মালয়েশিয়ার সঙ্গে ২৩টি, থাইল্যান্ডের সঙ্গে ১২টি এবং ফিলিপাইনের সঙ্গে ১৯টি আন্তর্জাতিক সাবমেরিন ক্যাবলের সংযোগ রয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক সাবমেরিন সংযোগ বর্তমানে মাত্র দুটি। ফলে কোনো একটি ক্যাবলে ত্রুটি, দুর্ঘটনা কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হলে দেশের ইন্টারনেট ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ইতোমধ্যে সরকারের তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল SEA-ME-WE-6 প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। এটি চালু হলে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তবে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে এটিও যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে SEA-ME-WE-4-এর কার্যকাল ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকায় নতুন সক্ষমতা যুক্ত করার বিষয়ে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় বেসরকারি খাতে নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের অনুমোদনকে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কর্মশালায় জানানো হয়, প্রস্তাবিত বেসরকারি ক্যাবলগুলো চালু করা সম্ভব হলে প্রায় ৫১ টেরাবিট অতিরিক্ত সক্ষমতা যুক্ত হতে পারে। এতে দেশের মোট সক্ষমতা প্রায় ৬৭ টেরাবিটে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির ওপর নির্ভরতাও কমতে পারে।
বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল চালু হলে সাধারণ গ্রাহকের জন্য ইন্টারনেটের দাম কমার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে দাবি করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল হাকিমের মতে, বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলে ইন্টারনেটের দাম সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সঙ্গে সেবার মান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তে পারে এবং ল্যাটেন্সি কমার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এগুলো সংশ্লিষ্টদের পূর্বাভাস ও দাবি; বাস্তবে গ্রাহক পর্যায়ে দাম কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে বাজার প্রতিযোগিতা, নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত, অপারেটরদের খরচ ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর।
বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্যাবল সিস্টেমের একটি প্রকল্প ইতোমধ্যে অনেকটা এগিয়েও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথম দিকে সমুদ্রপথের রুট সার্ভের কাজ শেষ হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সাবমেরিন ক্যাবল ও কারিগরি সরঞ্জাম তৈরির কাজও সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি সমুদ্রের তলদেশে ক্যাবল স্থাপনের জন্য বিশেষায়িত জাহাজও বুকিং দেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের শেষ দিকে ক্যাবল স্থাপনের কাজ শুরু এবং ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে গ্রাহক পর্যায়ে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সরকারি অনুমোদনের জটিলতায় প্রকল্পটি অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
প্রকল্পটির জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি সনদ বা এনওসি না পাওয়ায় ক্যাবল স্থাপনের চূড়ান্ত কাজ এগোতে পারছে না বলে কর্মশালায় জানানো হয়। এরই মধ্যে প্রকল্পের জন্য ভাড়া করা জাহাজগুলোর দেশীয় জলসীমায় প্রবেশ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ‘বাংলাদেশে এখনই ব্যান্ডউইথ সংকট চলছে’—এমন ধারণা তৈরি হওয়া ঠিক হবে না। এর আগে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি) জানিয়েছিল, দেশের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংযোগে বর্তমানে কোনো ব্যান্ডউইথ সংকট নেই। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, SEA-ME-WE-4 ও SEA-ME-WE-5-এর সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ২০০ জিবিপিএস; এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ১০০ জিবিপিএস ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আরও প্রায় ৩ হাজার ১০০ জিবিপিএস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।
বিএসসিপিএলসি আরও জানিয়েছিল, SEA-ME-WE-5-এর লিট-আপ ক্যাপাসিটি ২ হাজার ২০০ জিবিপিএস এবং এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪৮৮ জিবিপিএস ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ সেখানে প্রায় ৭১২ জিবিপিএস অব্যবহৃত সক্ষমতা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, SEA-ME-WE-5-এর কার্যকাল ২০৩৭ সাল পর্যন্ত নির্ধারিত। একইভাবে SEA-ME-WE-4-এর সক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ৬৫০ জিবিপিএস এবং এর কার্যকাল ২০৩০ সাল পর্যন্ত।
বিএসসিপিএলসি জানিয়েছে, ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণের জন্য SEA-ME-WE-6 প্রকল্পের কাজও চলছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০২৭ সালের শুরুতে এটি চালু হলে কক্সবাজার-সিঙ্গাপুর ও কক্সবাজার-মুম্বাই রুটে প্রায় ৩০ হাজার জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ সরবরাহ সম্ভব হবে এবং রাষ্ট্রীয় সাবমেরিন ক্যাবলগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় ৩৮ হাজার জিবিপিএসে উন্নীত হবে। অর্থাৎ বর্তমান আলোচনাটি মূলত তাৎক্ষণিক সংকটের চেয়ে ভবিষ্যতের দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদা মোকাবিলায় আগাম সক্ষমতা নিশ্চিত করার বিষয়।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবমেরিন ক্যাবল পরিকল্পনা, অর্থায়ন, নির্মাণ, সমুদ্রতলে স্থাপন ও বাণিজ্যিকভাবে চালু করতে কয়েক বছর সময় প্রয়োজন হয়। ফলে সংকট প্রকট হওয়ার পর নতুন ক্যাবলের উদ্যোগ নিলে প্রয়োজনের সময়ে অতিরিক্ত সক্ষমতা পাওয়া নাও যেতে পারে। এ কারণেই ২০২৮ সালের সম্ভাব্য ঘাটতির পাশাপাশি ২০৩০ ও ২০৩৫ সালের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকেই নতুন আন্তর্জাতিক সংযোগের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—বাড়তে থাকা ইন্টারনেট চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত ও বহুমুখী আন্তর্জাতিক সংযোগ নিশ্চিত করা। নতুন সাবমেরিন ক্যাবল সময়মতো যুক্ত করা গেলে একদিকে ভবিষ্যৎ ব্যান্ডউইথ ঘাটতির ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর সম্ভাব্য সুফল হিসেবে কম দাম, ভালো গতি ও উন্নত সেবা পেতে পারেন দেশের কোটি কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। আর সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘসূত্রতা হলে ২০২৮ সালের পর বাড়তি চাহিদা সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!