চট্টগ্রাম বিভাগের সাম্প্রতিক বন্যা, পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারে ১০ কোটি টাকার মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এইচএসবিসি বাংলাদেশ। এ অর্থ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, জীবিকা ফিরিয়ে আনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করা হবে।

রোববার চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ পুনর্বাসন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী ও সংসদ সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক স্বরূপ কুমার চৌধুরী, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান এবং ব্র্যাকের দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি ও ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন প্রোগ্রামের পরিচালক মো. লিয়াকত আলী বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এইচএসবিসি বাংলাদেশের অর্থায়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক সাত মাসের এ পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। এর মধ্যে ছয় মাস ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সরাসরি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। পরবর্তী এক মাসে প্রকল্পের ফলাফল ও অগ্রগতির ভিত্তিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্প্রতি ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের ১০টি জেলা আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ধস এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। এতে ১০ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানিতে বহু মানুষের বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পানির উৎস, স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও কৃষিজমিতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে শুধু জরুরি ত্রাণ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান। কর্মসূচির আওতায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড, সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলা এবং কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

পুনর্বাসন কর্মসূচির অন্যতম বড় অংশ হিসেবে ৫০টি ক্ষতিগ্রস্ত স্কুল মেরামত ও সংস্কার করা হবে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণও বিতরণ করা হবে। বন্যার কারণে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হওয়া শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনতে এ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আবাসন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট উদ্যোগ। প্রকল্পের আওতায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ২৫০টি ঘর পুনর্নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি ৪০০টি ল্যাট্রিন মেরামত বা নতুন করে নির্মাণ এবং ৩০টি টিউবওয়েল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়তা হবে।

বন্যায় অনেক পরিবারের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জীবিকা পুনর্গঠনের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় ৩০০টি অসচ্ছল পরিবারকে জীবিকা পুনরুদ্ধারে সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে কৃষির ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ৬০০ কৃষক পরিবারকে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহ করা হবে।

এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান বলেন, তাদের দায়িত্ব কেবল ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে, তাদের জীবনমান উন্নয়নেও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

তিনি বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে বাসস্থান, জীবিকা এবং জরুরি সেবায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মাহবুব উর রহমান আরও বলেন, দেশের মানুষের কল্যাণে এইচএসবিসি সবসময় কাজ করার চেষ্টা করেছে। পুনর্বাসন কর্মসূচির অর্থ দিয়ে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, জীবিকা পুনরুদ্ধার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। প্রকল্পের আওতায় অন্তত ১২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার কোনো না কোনোভাবে সহায়তা পাবে বলেও জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

তিনি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষের জন্য অনেক কাজ দ্রুত ও কার্যকরভাবে করা সম্ভব। এ ধরনের অংশীদারত্বের ফলে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতি কমিয়ে আনার সুযোগও তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক খাদ্য ও জরুরি সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন অত্যন্ত জরুরি। ঘরবাড়ি, শিক্ষা, পানি-স্যানিটেশন ও জীবিকা—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে একসঙ্গে সহায়তা পৌঁছে দেওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ অনেকটাই সহজ হবে। এই লক্ষ্যেই সাত মাসের এ কর্মসূচিকে সাজানো হয়েছে বলে জানান তারা।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!