বিবাহ ইসলামে শুধু একটি সামাজিক চুক্তি নয়; এটি ভালোবাসা, শান্তি, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মানের একটি পবিত্র বন্ধন। আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ভালোবাসা ও রহমতের সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই দাম্পত্য জীবনে কথা বলা, একে অপরকে সম্বোধন করা এবং আচরণের ক্ষেত্রেও শালীনতা ও ইসলামী আদব বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের সমাজে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে বিভিন্নভাবে ডাকেন। কেউ নাম ধরে ডাকেন, কেউ ভালোবাসার ডাকনাম ব্যবহার করেন, আবার কেউ সন্তানদের নামের সঙ্গে মিলিয়ে ‘অমুকের বাবা’ বা ‘অমুকের মা’ বলে সম্বোধন করেন। তবে অনেক সময় মজা বা স্নেহের বশে কেউ কেউ স্বামীকে ‘ভাই’ কিংবা স্ত্রীকে ‘বোন’ বলেও ডাকেন।
এখন প্রশ্ন হলো—এ ধরনের সম্বোধন ইসলামে কতটা গ্রহণযোগ্য? স্বামীকে ‘ভাই’ বা স্ত্রীকে ‘বোন’ বললে কি বৈবাহিক সম্পর্কে কোনো সমস্যা তৈরি হয়? তালাক হয়ে যায় কি না—এ বিষয়ে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি জানা প্রয়োজন।
দাম্পত্য সম্পর্ক ভালোবাসা ও রহমতের বন্ধন
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ কর এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।”
(সুরা আর-রূম: ২১)
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন—
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর।”
(সুরা আন-নিসা: ১৯)
এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো ভালোবাসা, সম্মান ও সুন্দর আচরণ। তাই এমন শব্দ ব্যবহার করা উচিত, যা সম্পর্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।
‘ভাই’ বা ‘বোন’ সম্বোধন সম্পর্কে হাদিসে কী এসেছে?
এ বিষয়ে সুনানে আবু দাউদে একটি বর্ণনায় এসেছে—
أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِامْرَأَتِهِ: يَا أُخَيَّةُ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: «أُخْتُكَ هِيَ؟» فَكَرِهَ ذَلِكَ وَنَهَى عَنْهُ
‘এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে বলল, ‘হে আমার ছোট বোন!’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘সে কি তোমার বোন?’ তিনি এ ধরনের সম্বোধন অপছন্দ করলেন এবং তা থেকে নিষেধ করলেন।’ (আবু দাউদ ২২১০)
তবে মুহাদ্দিসদের মধ্যে এ হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। শায়খ আলবানি (রহ.) এই হাদিসের সনদকে দুর্বল বলেছেন। তাই শুধু এই বর্ণনার ভিত্তিতে এটিকে সরাসরি হারাম বা নিশ্চিত নিষিদ্ধ বলা সতর্কতার বিষয়।
হানাফি ফিকহে এর বিধান
হানাফি ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। সেখানে স্ত্রীকে ‘আমার মা’, ‘আমার মেয়ে’, ‘আমার বোন’ ইত্যাদি সম্বোধন করাকে অপছন্দনীয় বা মাকরূহ বলা হয়েছে।
তবে শুধু ‘হে বোন’ বা ‘হে বোনের মতো’ ধরনের সাধারণ সম্বোধনের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক বা জিহার হয়ে যায় না।
অর্থাৎ হানাফি ফিকহের আলোকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একে অপরকে ‘ভাই’ বা ‘বোন’ বলা উত্তম নয়; তবে এর কারণে বিবাহ ভেঙে যায় না।
তাহলে ‘ভাই’ ডাকলে কি তালাক হয়ে যাবে?
না। শুধু স্বামীকে ‘ভাই’ বলা বা স্ত্রীকে ‘বোন’ বলে ডাকার কারণে তালাক হয় না।
কারণ সাধারণ সম্বোধন হিসেবে ‘ভাই’ বা ‘বোন’ শব্দগুলো তালাকের স্পষ্ট শব্দ নয়। তাই এমন কথা বলার কারণে স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় না।
তবে যদি কেউ স্ত্রীকে নিজের মা বা কোনো মাহরাম নারীর সঙ্গে বৈবাহিক অর্থে তুলনা করার উদ্দেশ্যে এমন শব্দ ব্যবহার করেন, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে শব্দের অর্থ, নিয়ত ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে কোনো অভিজ্ঞ আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
নবীজি (সা.)-এর দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসার সম্বোধন
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে অত্যন্ত সুন্দর ও স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন। হজরত আয়েশা (রা.)-কে তিনি আদরের সঙ্গে ‘আয়িশ’ বলে ডাকতেন।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেছিলেন—
“হে আয়িশ! এই যে জিবরাইল, তিনি তোমাকে সালাম জানাচ্ছেন।”
(সহিহ বুখারি: ৩৭৬৮)
এ থেকে বোঝা যায়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসাপূর্ণ ও সম্মানজনক ডাকনাম ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
স্বামী-স্ত্রী কীভাবে একে অপরকে ডাকবেন?
স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে এমনভাবে সম্বোধন করতে পারেন, যাতে ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ পায়। যেমন—
- নিজের নাম ধরে;
- আদরের বৈধ ডাকনামে;
- ‘অমুকের বাবা’ বা ‘অমুকের মা’ বলে;
- পারিবারিকভাবে প্রচলিত সম্মানজনক সম্বোধনে।
তবে ‘ভাই’, ‘বোন’, ‘মা’, ‘বাবা’—এ ধরনের শব্দ, যা প্রকৃত সম্পর্কের সঙ্গে ভিন্ন অর্থ তৈরি করে, সেগুলো নিয়মিত ব্যবহারে না যাওয়াই উত্তম।
মজা করেও কি ‘ভাই-বোন’ বলা উচিত?
দাম্পত্য জীবনে হাসি-ঠাট্টা ও রসিকতার সুযোগ রয়েছে। তবে এমন শব্দ ব্যবহার করা, যা ইসলামী দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় বলা হয়েছে, তা অভ্যাসে পরিণত না করাই ভালো।
ভালোবাসা প্রকাশের জন্য আরও সুন্দর ও অর্থবহ শব্দ ব্যবহার করা দাম্পত্য সম্পর্কের জন্যও উত্তম।
ইসলামী দৃষ্টিতে শেষ কথা
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আল্লাহর দেওয়া একটি বড় নিয়ামত। এই সম্পর্কে ভালোবাসা, সম্মান, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সহযোগিতাই হওয়া উচিত মূল ভিত্তি।
হানাফি ফিকহের আলোকে স্বামীকে ‘ভাই’ বা স্ত্রীকে ‘বোন’ বলে সম্বোধন করা অনুচিত বা মাকরূহ হিসেবে বিবেচিত হলেও, শুধু এ কারণে তালাক হয়ে যায় না এবং বৈবাহিক সম্পর্কও নষ্ট হয় না।
তাই অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে দাম্পত্য সম্পর্কের মর্যাদা বজায় রাখতে নাম ধরে, আদরের নামে কিংবা সম্মানজনক সম্বোধনে একে অপরকে ডাকাই উত্তম। এতে ভালোবাসা বাড়ে এবং শরয়ি সংশয় থেকেও মুক্ত থাকা যায়।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!