দোয়া একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের অন্যতম মাধ্যম। মানুষ যখন বিপদে পড়ে, কোনো প্রয়োজন দেখা দেয় কিংবা নিজের মনের কথা কাউকে বলতে না পারে, তখন আল্লাহর কাছেই ফিরে যায়। তবে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে—সব সময় দোয়া করা গেলেও এমন কি কোনো বিশেষ সময় আছে, যখন দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি? কোরআন ও সহিহ হাদিসে এমন কিছু সময় ও অবস্থার কথা এসেছে, যেগুলোতে দোয়া করার ব্যাপারে বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।

প্রথমেই মনে রাখতে হবে, দোয়া কবুল হওয়া আল্লাহর ইখতিয়ার বা সিদ্ধান্তের বিষয়। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে দোয়া করলেই অবশ্যই নিজের চাওয়া অনুযায়ী ফল পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা ইসলাম দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দার দোয়া কবুল হতে থাকে যতক্ষণ সে তাড়াহুড়া না করে এবং এমন না বলে যে, “আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।” (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)। তাই দোয়ার সঙ্গে ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা থাকা জরুরি।

দোয়া কবুলের বিশেষ সময়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রতি রাতে যখন শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান করেন—কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব; কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেব; কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)। তাই তাহাজ্জুদের সময় বা রাতের শেষভাগ দোয়ার জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ সময়।

রাতের এই সময়ে দোয়া করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো একটি বাক্য বাধ্যতামূলক নয়। একজন মানুষ নিজের ভাষায়ও আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন তুলে ধরতে পারেন। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া পড়া উত্তম। যেমন—

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

বাংলা উচ্চারণ: রব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাওঁ, ওয়া ফিল-আখিরাতি হাসানাতাওঁ, ওয়াকিনা আজাবান-নার।

অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। (সুরা বাকারা: ২০১)

সিজদার সময় দোয়া করারও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয় সিজদার অবস্থায়। তাই সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করতে বলা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম)। নামাজের সিজদায় আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন, ক্ষমা ও কল্যাণ চাওয়া যেতে পারে। তবে ফরজ নামাজে সিজদার দোয়ার ক্ষেত্রে নিজের অনুসৃত মাজহাবের ফিকহি বিধান অনুসরণ করা ভালো।

আযান ও ইকামতের মাঝের সময়টিও দোয়ার জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে করা দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না। (সুনান আবু দাউদ, জামে তিরমিজি)। তাই আযান শোনার পর আজানের জবাব দিয়ে, দরুদ পড়ে এবং নামাজ শুরু হওয়ার আগের সময়টুকু দোয়ায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

বৃষ্টির সময়ও দোয়া করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। আবু দাউদে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, দুটি দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না—আযানের সময়ের দোয়া এবং বৃষ্টির সময়ের দোয়া। হাদিসটির সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা থাকলেও অনেক আলেম এটিকে গ্রহণযোগ্য বলেছেন। তাই বৃষ্টি হলে আল্লাহর রহমতের কথা স্মরণ করে নিজের জন্য, পরিবার ও মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা ভালো।

রোজাদারের দোয়া সম্পর্কেও বিশেষ ফজিলত এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন ব্যক্তির দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয় না—ন্যায়পরায়ণ শাসক, রোজাদার যখন ইফতার করে এবং মজলুমের দোয়া। (জামে তিরমিজি)। তাই রোজা অবস্থায় এবং বিশেষ করে ইফতারের সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করা গুরুত্বপূর্ণ।

ইফতারের সময় নিজের জন্য দোয়ার পাশাপাশি একটি কোরআনি দোয়া পড়া যেতে পারে—

رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

বাংলা উচ্চারণ: রব্বানা জালামনা আনফুসানা, ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল-খাসিরিন।

অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তাহলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। (সুরা আরাফ: ২৩)

জুমার দিনেও দোয়া কবুলের একটি বিশেষ সময় রয়েছে। সহিহ বুখারিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে দাঁড়িয়ে দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। তবে সেই সময়টি নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অনেক আলেম আসরের পর সূর্যাস্তের আগের সময়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, আবার অনেকে খুতবা ও নামাজের সময়কেও সম্ভাব্য সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই জুমার দিনে বিশেষভাবে বেশি বেশি দোয়া করা উত্তম।

মজলুমের দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারেও কঠোর সতর্কতা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মজলুমের দোয়া এবং আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা থাকে না। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)। তাই কারও ওপর জুলুম করা থেকে বেঁচে থাকা যেমন জরুরি, তেমনি নিজে অন্যায়ের শিকার হলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়াও বৈধ।

দোয়ার জন্য সুস্থতা ও স্বাভাবিক সময়ের পাশাপাশি বিপদের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি চায় তার দোয়া বিপদের সময় কবুল হোক, সে যেন স্বচ্ছলতার সময়ও বেশি বেশি দোয়া করে। (জামে তিরমিজি)। অর্থাৎ শুধু বিপদে পড়ে আল্লাহকে ডাকলে হবে না; সুখের সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে।

তবে দোয়া কবুলের জন্য শুধু সময় নির্বাচন করাই যথেষ্ট নয়। হালাল উপার্জন ও পবিত্র জীবনযাপনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহিহ মুসলিমে রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে দীর্ঘ সফরে, ধুলোমলিন অবস্থায় হাত তুলে আল্লাহকে ডাকছে, কিন্তু তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম এবং তার লালন-পালনও হারাম উপার্জন থেকে; এরপর রাসুল (সা.) প্রশ্ন করেন, তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে? (সহিহ মুসলিম)। তাই দোয়ার পাশাপাশি নিজের উপার্জন ও জীবনযাপনের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

দোয়া করার সময় আল্লাহর প্রশংসা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর দরুদ পড়াও গুরুত্বপূর্ণ আদব। এক ব্যক্তি আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ ছাড়া সরাসরি দোয়া করছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে শিক্ষা দেন যে, প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করা, এরপর নবী (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা এবং তারপর নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী দোয়া করা উচিত। (জামে তিরমিজি)।

দোয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ অনেক সময় কয়েক দিন দোয়া করে প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে মনে করেন, তার দোয়া কবুল হয়নি। অথচ আল্লাহ কখন, কীভাবে এবং কোন উপায়ে বান্দার জন্য কল্যাণ নির্ধারণ করবেন, তা মানুষ জানে না। তাই দোয়া করতে হবে দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রেখে।

দোয়া করার সময় নিজের ভুলের জন্য ইস্তিগফার ও তাওবা করাও জরুরি। বলা যায়—

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

বাংলা উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি।

অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর কাছেই তাওবা করি।

তবে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যাকে এমনভাবে বলা উচিত নয় যে নির্দিষ্ট সংখ্যকবার পড়লেই দোয়া অবশ্যই কবুল হবে। বরং আন্তরিকভাবে তাওবা করা এবং গুনাহ থেকে ফিরে আসাই মূল বিষয়।

সবশেষে বলা যায়, দোয়ার জন্য রাতের শেষ তৃতীয়াংশ, সিজদা, আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়, রোজাদারের ইফতারের সময় এবং জুমার দিনের বিশেষ সময়ের মতো বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ মুহূর্ত রয়েছে। তবে দোয়ার প্রকৃত শক্তি শুধু সময়ের মধ্যে নয়; এর সঙ্গে রয়েছে বান্দার আন্তরিকতা, আল্লাহর ওপর ভরসা, হালাল জীবনযাপন, তাওবা এবং ধৈর্য। তাই শুধু বিশেষ সময়ের অপেক্ষা না করে প্রতিদিন আল্লাহকে ডাকতে হবে।

আজকের শিক্ষা: দোয়ার জন্য বিশেষ সময়ের মধ্যে রাতের শেষ তৃতীয়াংশ, সিজদা, আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময় এবং রোজাদারের ইফতারের সময়কে গুরুত্ব দিন। তবে দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন এবং হালাল জীবনযাপন ও তাওবার মাধ্যমে নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করুন।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!