লোডশেডিং শুরু হলে অনেকেই হঠাৎ করে ঘরের সব বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আবার বিদ্যুৎ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজ, টিভি, এসি, কম্পিউটার, পানির পাম্পসহ একাধিক যন্ত্র একসঙ্গে চালু করে দেন। কিন্তু বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এবং ফিরে আসার সময় একটু সচেতন না হলে দামি বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর আবার ফিরে আসার সময় ভোল্টেজের অস্বাভাবিক ওঠানামা বা পাওয়ার সার্জ হতে পারে। Electrical Safety Foundation International (ESFI) বলছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর বিদ্যুৎ ফিরে এলে সার্জ টিভি, বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র, এমনকি এয়ার কন্ডিশনারের মতো সিস্টেমের ক্ষতি করতে পারে। এ কারণে সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

তাহলে লোডশেডিং হলে কোন যন্ত্র আগে বন্ধ করবেন? আর বিদ্যুৎ ফিরে এলে কোনগুলো আগে চালু করা উচিত? বিষয়টি সহজভাবে জেনে নেওয়া যাক।

প্রথমেই বন্ধ করুন কম্পিউটার ও সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্র

লোডশেডিং শুরু হলে ডেস্কটপ কম্পিউটার, মনিটর, প্রিন্টারসহ সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রকে প্রথম অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কম্পিউটারে গুরুত্বপূর্ণ কাজ চললে UPS থাকলে দ্রুত কাজটি সংরক্ষণ করে নিরাপদভাবে শাটডাউন করুন।

হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে কম্পিউটারের কাজের তথ্য হারানোর পাশাপাশি বৈদ্যুতিক সমস্যার কারণে যন্ত্রপাতির ক্ষতিও হতে পারে। ESFI-এর মতে, হঠাৎ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রে ডেটা হারানো বা বৈদ্যুতিক সিস্টেমের ক্ষতির ঝুঁকি থাকতে পারে।

তাই কম্পিউটারকে ‘পরে বন্ধ করব’—এমন না করে লোডশেডিং শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ করা ভালো।

এরপর টিভি ও অন্যান্য বিনোদনমূলক যন্ত্র বন্ধ করুন

কম্পিউটারের পর টিভি, Android TV Box, সেট-টপ বক্স, গেমিং কনসোল, সাউন্ড সিস্টেমসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র বন্ধ করে দেওয়া ভালো।

শুধু রিমোট দিয়ে টিভি স্ট্যান্ডবাই অবস্থায় রেখে দেওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজন হলে মেইন সুইচ বা নিরাপদ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যেতে পারে। বিশেষ করে যদি এলাকায় বিদ্যুৎ বারবার আসা-যাওয়া করে, তখন সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রগুলো পাওয়ার সার্জ থেকে সুরক্ষিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

Ready.gov-এর বিদ্যুৎ বিভ্রাট-সংক্রান্ত নির্দেশনাতেও বৈদ্যুতিক যন্ত্র, সরঞ্জাম ও ইলেকট্রনিকস আনপ্লাগ করে রাখার কথা বলা হয়েছে, যাতে বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময় সার্জের কারণে ক্ষতির ঝুঁকি কমে।

মোবাইল চার্জার ও অপ্রয়োজনীয় অ্যাডাপ্টার খুলে রাখুন

লোডশেডিংয়ের সময় মোবাইল চার্জে না থাকলেও অনেক চার্জার সকেটে লাগানো থাকে। একইভাবে ল্যাপটপ চার্জার, স্পিকার, রাউটার অ্যাডাপ্টার কিংবা অন্যান্য ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইসও সংযুক্ত থাকতে পারে।

বিদ্যুৎ চলে গেলে অপ্রয়োজনীয় চার্জার ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা যেতে পারে। এতে বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময় সম্ভাব্য সার্জ থেকে এসব অ্যাডাপ্টার ও ডিভাইসকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া যায়।

তবে রাউটার যদি UPS বা Mini UPS-এর মাধ্যমে সচল রাখা প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটি অপ্রয়োজনে বন্ধ করার দরকার নেই।

এসি বন্ধ করুন, তবে বিদ্যুৎ ফিরে এলেই চালু করবেন না

এসি তুলনামূলক বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং এর কম্প্রেসর চালুর সময় বাড়তি বৈদ্যুতিক প্রবাহের প্রয়োজন হয়। তাই লোডশেডিং শুরু হলে এসি বন্ধ রাখা উচিত।

তবে শুধু রিমোট দিয়ে বন্ধ করে বিদ্যুৎ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আবার চালু করার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো। বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর সরবরাহ স্থিতিশীল হয়েছে কি না দেখে তারপর এসি চালু করুন।

বিদ্যুৎ বারবার আসা-যাওয়া করলে এসির মতো বড় লোডের যন্ত্র চালু হওয়ার সময় সার্জ বা বৈদ্যুতিক অস্থিরতার ঝুঁকি থাকতে পারে। ESFI জানিয়েছে, বড় বৈদ্যুতিক লোড চালু ও বন্ধ হওয়ার সময়ও সার্জ তৈরি হতে পারে এবং পাওয়ার রিকভারির সময়ও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।

পানির পাম্প ও অন্যান্য মোটরচালিত যন্ত্র বন্ধ রাখুন

পানির পাম্প, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ, ইলেকট্রিক ওভেন বা অন্যান্য উচ্চক্ষমতার যন্ত্রও লোডশেডিংয়ের সময় বন্ধ রাখা উচিত।

বিশেষ করে বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময় এসব যন্ত্র একসঙ্গে চালু করলে বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইনে হঠাৎ বেশি লোড তৈরি হতে পারে। তাই বিদ্যুৎ ফিরে এলে সব ভারী যন্ত্র একসঙ্গে চালু না করে প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে চালু করা নিরাপদ অভ্যাস।

Ready.gov-ও জরুরি পাওয়ার ব্যবস্থায় সব বৈদ্যুতিক যন্ত্র একসঙ্গে চালানোর পরিবর্তে কোন কোন যন্ত্র আগে প্রয়োজন তা অগ্রাধিকার দিয়ে নির্ধারণ করার পরামর্শ দিয়েছে।

ফ্রিজের ক্ষেত্রে নিয়মটা একটু আলাদা

ফ্রিজকে কম্পিউটার বা টিভির মতো লোডশেডিং শুরু হলেই বারবার সুইচ অফ-অন করার প্রয়োজন নেই। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ফ্রিজের দরজা বন্ধ রাখা।

বিদ্যুৎ না থাকলেও বন্ধ দরজার কারণে ফ্রিজের ভেতরের ঠান্ডা কিছু সময় ধরে রাখা যায়। Ready.gov-এর তথ্য অনুযায়ী, দরজা বন্ধ থাকলে একটি সাধারণ ফ্রিজ প্রায় ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত খাবার ঠান্ডা রাখতে পারে।

তবে যদি এলাকায় বিদ্যুৎ ঘন ঘন আসা-যাওয়া করে এবং বারবার পাওয়ার ওঠানামা হয়, তখন নিরাপদভাবে ফ্রিজের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। বিদ্যুৎ স্থিতিশীল হওয়ার পর পুনরায় সংযোগ দেওয়া ভালো। ফ্রিজের ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রস্তুতকারকের নির্দেশনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বিদ্যুৎ ফিরে এলে কোন যন্ত্র আগে চালাবেন?

বিদ্যুৎ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে সব যন্ত্র একসঙ্গে চালু না করাই ভালো। প্রথমে সাধারণ লাইট বা ফ্যান চালিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল কি না দেখুন।

এরপর প্রয়োজনীয় রাউটার ও ONT চালু করা যেতে পারে। তারপর টিভি, কম্পিউটার বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র চালু করুন। ফ্রিজের ক্ষেত্রে যদি সেটি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়ে থাকে, তাহলে বিদ্যুৎ স্থিতিশীল হওয়ার পর প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী চালু করুন।

সবশেষে এসি, পানির পাম্প, ওয়াশিং মেশিন বা অন্যান্য উচ্চক্ষমতার যন্ত্র চালু করা ভালো। এতে একসঙ্গে অনেক বড় লোড পড়ার সম্ভাবনা কমে।

বারবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করলে কী করবেন?

যদি বিদ্যুৎ কয়েক মিনিট পরপর চলে যায় এবং আবার ফিরে আসে, তাহলে সবচেয়ে বেশি সতর্ক হতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে কম্পিউটার, টিভি ও অন্যান্য সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্র আনপ্লাগ করে রাখা ভালো।

যেসব যন্ত্র নিয়মিত চালু রাখা জরুরি, সেগুলোর জন্য উপযুক্ত UPS বা Surge Protective Device ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, সাধারণ পাওয়ার স্ট্রিপ আর প্রকৃত surge protector এক জিনিস নয়। ESFI বলছে, সঠিক Surge Protective Device ব্যবহার করাই পাওয়ার সার্জ থেকে যন্ত্রপাতি সুরক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা।

সহজে মনে রাখুন—‘সংবেদনশীল আগে, ভারী পরে’

লোডশেডিংয়ের সময় খুব সহজ একটি নিয়ম মনে রাখা যায়—সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্র আগে নিরাপদ করুন, এরপর উচ্চক্ষমতার যন্ত্রগুলো বন্ধ করুন।

অর্থাৎ কম্পিউটার ও টিভির মতো সংবেদনশীল যন্ত্র আগে বন্ধ বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন। এরপর এসি, পানির পাম্প ও অন্যান্য ভারী যন্ত্র বন্ধ রাখুন। ফ্রিজের ক্ষেত্রে বারবার সুইচ না করে দরজা বন্ধ রাখাকে অগ্রাধিকার দিন।

শেষ কথা

লোডশেডিংয়ের সময় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ করার কোনো একক বাধ্যতামূলক ‘৫-৪-৩-২-১’ নিয়ম নেই। কোন যন্ত্র আগে বন্ধ করবেন, তা নির্ভর করে যন্ত্রটির ধরন, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পরিস্থিতি এবং আপনার বাসার বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ওপর। তবে কম্পিউটার ও সংবেদনশীল ইলেকট্রনিকস আগে নিরাপদ করা, এসি ও উচ্চক্ষমতার যন্ত্র বন্ধ রাখা, ফ্রিজের দরজা না খোলা এবং বিদ্যুৎ ফিরে এলে সব যন্ত্র একসঙ্গে চালু না করা—এগুলো নিরাপদ ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস।

বিশেষ করে বিদ্যুৎ বারবার আসা-যাওয়া করলে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সামান্য সচেতনতা দামি টিভি, কম্পিউটার, ফ্রিজ বা এসির সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে পরিবারকে রক্ষা করতে পারে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!