সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বাংলাদেশ। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এ উদ্যোগে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। তবে এখনো চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ঢাকা।

রয়টার্সের ২৫ আগস্টের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠলে বাংলাদেশ তাতে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মক্কা চুক্তিতে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।

যে চুক্তি ঘিরে আলোচনা

গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে সই করে। চুক্তির মূল নীতি হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান পরে বলেন, পারস্পরিক প্রতিরক্ষার দিক থেকে চুক্তিটি ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে কারিগরিভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়নি। চুক্তির পক্ষগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, এর উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ শক্তিশালী করা। চুক্তিটি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা তীব্র।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন পরীক্ষা

বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখা ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

এই পরিস্থিতিতে কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যোগ দিলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এমন কোনো জোটে যুক্ত হলে ভারতের পাশাপাশি চীন, ইরান, জাপান, উপসাগরীয় দেশগুলো, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সমীকরণেও প্রভাব পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু সামরিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভারতের প্রতিক্রিয়া বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। কারণ মক্কা চুক্তির তিন অংশীদারের একজন পাকিস্তান—যার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক রয়েছে।

রয়টার্স বলছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বর্তমানে বিভিন্ন ইস্যুতে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সীমান্ত পরিস্থিতি এবং ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ—দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন।

এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোয় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নয়াদিল্লি কীভাবে দেখবে, তা ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বিবেচনার বিষয় হতে পারে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও মক্কা চুক্তির বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

অর্থনীতির হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য এ সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনীতি তৈরি পোশাক রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থও বৈদেশিক মুদ্রার গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, কোনো নির্দিষ্ট সামরিক জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব তৈরি হতে পারে। ফলে নিরাপত্তাগত সুবিধার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

চুক্তির পরিধি আরও বাড়ার সম্ভাবনা

মক্কা চুক্তিকে শুধু তিন দেশের মধ্যকার সামরিক সমঝোতা হিসেবে দেখার সুযোগও সীমিত হতে পারে। তুরস্কের পক্ষ থেকে জোটটি ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের আগ্রহের কথা জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে মিশরসহ আরও কয়েকটি দেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এ ছাড়া চুক্তির আওতায় তিন দেশ রাজনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি যৌথ সামরিক মহড়া এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা জোরদারের পরিকল্পনা করছে বলে পরবর্তী এক রয়টার্স প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

সৌদি আরবের আমন্ত্রণ এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

ফলে ‘বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দিয়েছে’ এমন কোনো দাবি করার সুযোগ নেই। বর্তমান অবস্থান হলো, সৌদি আরবের আমন্ত্রণের পর সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করছে ঢাকা।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ এই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হবে কি না, তা নির্ভর করবে জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, মধ্যপ্রাচ্যের অংশীদারদের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং দেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ওপর।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!