সকালবেলা চোখের পাতা খোলার আগেই হাতটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায় বালিশের পাশে রাখা আলো ছড়ানো ছোট্ট ডিভাইসটির দিকে। ঘড়ির অ্যালার্ম বন্ধ করার মধ্য দিয়ে যার শুরু, রাতে স্ক্রিনের দিকে শেষবার তাকানো পর্যন্ত তা আমাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। ঘুম থেকে ওঠার পর দিনের প্রথম কাজ, আবার ঘুমাতে যাওয়ার আগে শেষ কাজও অনেকের জীবনেই এখন স্মার্টফোনকে ঘিরে।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই স্মার্টফোন কি সত্যিই আমাদের জীবনকে সহজ ও গতিশীল করেছে, নাকি নিঃশব্দে কেড়ে নিচ্ছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ‘সময়’?

উত্তরটি এককথায় দেওয়া কঠিন। কারণ স্মার্টফোন একই সঙ্গে আমাদের সময় বাঁচাচ্ছে এবং সময় কেড়েও নিচ্ছে। পার্থক্যটা নির্ভর করছে আমরা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তি আমাদের অভ্যাসকে পরিচালনা করছে তার ওপর।

হাতের মুঠোয় পুরো পৃথিবী

স্মার্টফোনের ইতিবাচক দিক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একসময় যে কাজের জন্য ব্যাংকে যেতে হতো, এখন তা কয়েকটি স্পর্শেই করা যায়। দূরের স্বজনের সঙ্গে কথা বলা, অনলাইন ক্লাস, অফিসের কাজ, কেনাকাটা, টিকিট কাটা, পথ খুঁজে নেওয়া কিংবা জরুরি তথ্য সংগ্রহ সবই এখন হাতের মুঠোয়।

বাংলাদেশের ডিজিটাল বাস্তবতাও স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপকতা স্পষ্ট করে। DataReportal-এর Digital 2026: Bangladesh প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশে ৮২.৮ মিলিয়ন মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছিলেন এবং অক্টোবর ২০২৫-এ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারী-পরিচয় ছিল প্রায় ৬৪ মিলিয়ন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৭৭.৩ শতাংশ অন্তত একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছিলেন। তবে ‘user identities’ সবসময় আলাদা আলাদা ব্যক্তির সংখ্যা বোঝায় না এ বিষয়টিও প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে। অর্থাৎ স্মার্টফোন এখন শুধু কথা বলার যন্ত্র নয়। শিক্ষা, ব্যবসা, কর্মসংস্থান, সংবাদ, বিনোদন ও দৈনন্দিন যোগাযোগের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন প্রয়োজনের এই যন্ত্রটি অপ্রয়োজনীয় অভ্যাসে রূপ নেয়।

‘মাত্র পাঁচ মিনিট’ যে পাঁচ মিনিট আর শেষ হয় না,

কাজের ফাঁকে একটু ফোন হাতে নেওয়া হলো উদ্দেশ্য মাত্র পাঁচ মিনিট। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খোলা হলো। একটি ভিডিও বা রিলস দেখা হলো। একটি শেষ হতে না হতেই সামনে হাজির আরেকটি। আমরা ভাবি, আরেকটা দেখে ফোনটা রেখে দেব। কিন্তু সেই ‘আরেকটা’ কখন যে দশটা, বিশটা কিংবা পঞ্চাশটায় পৌঁছে যায়, তার হিসাব অনেক সময় থাকে না।

রিলস, শর্টস ও অন্যান্য স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওর বড় বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো আমাদের দীর্ঘ সময় বসার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে না বরং কয়েক সেকেন্ডের কনটেন্টের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী কনটেন্ট সামনে আসে। ফলে আমরা হয়তো একেকটি ভিডিওতে খুব অল্প সময় ব্যয় করছি, কিন্তু অসংখ্য ছোট ছোট সময়ের যোগফলে দিনের একটি বড় অংশ হারিয়ে ফেলছি।

এই হারিয়ে যাওয়া সময়ের কোনো অ্যালার্ম বাজে না। কোনো বিল আসে না। কেউ এসে বলে না ‘আজ আপনার দুই ঘণ্টা শেষ।’ সময়টা শুধু নিঃশব্দে চলে যায়।

রিলসের পর রিলস অ্যালগরিদমের সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা:

স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও এখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; শিক্ষা, সংবাদ, বিজ্ঞাপন ও ব্যবসাতেও এর ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু এর ‘endless scroll’ বা অবিরাম স্ক্রলিং ব্যবস্থা ব্যবহারকারীকে দীর্ঘ সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে রাখার সুযোগ তৈরি করে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি systematic review ও meta-analysis-এ ৭১টি গবেষণা এবং প্রায় ৯৮,৩০০ অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে বেশি short-form video ব্যবহারের সঙ্গে জ্ঞানীয় সক্ষমতার দুর্বলতার সম্পর্ক পাওয়া যায়; বিশেষ করে attention ও inhibitory control-এর সঙ্গে সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। তবে গবেষণাগুলোর বড় অংশ পর্যবেক্ষণমূলক হওয়ায় এটিকে সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এই সতর্কতাটিই গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা শুধু রিলস নয়; সমস্যা হলো আমরা কখন থামব, সেই সিদ্ধান্তটি ধীরে ধীরে আমাদের হাত থেকে সরে যাচ্ছে কি না। একটি ভিডিও আমরা নিজের ইচ্ছায় চালু করি। কিন্তু পরের ভিডিওটি অনেক সময় আমাদের নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ না দিয়েই সামনে চলে আসে।

ডুমস্ক্রোলিং ও মনোযোগের বিভাজন:

উদ্দেশ্যহীনভাবে একের পর এক কনটেন্ট স্ক্রল করার প্রবণতা এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত দৃশ্য। বিশেষ করে নেতিবাচক সংবাদ, উত্তেজনাপূর্ণ পোস্ট বা আকর্ষণীয় ভিডিওর ধারাবাহিকতা মানুষকে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে আটকে রাখতে পারে।

ফোন হয়তো খোলা হয়েছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেখার জন্য। বার্তা দেখা হয়ে গেছে। কাজ শেষ। কিন্তু স্ক্রলিং থামেনি।

এখানেই সময়ের চেয়েও বড় ক্ষতি হতে পারে মনোযোগের বিভাজন।

বই পড়তে বসেছি। পাশে ফোন। একটি নোটিফিকেশন এলো। ফোন হাতে নিলাম। কয়েক মিনিট পর আবার বইয়ে ফিরলাম। কিন্তু মনটা কি আগের জায়গায় ফিরল? সবসময় নয়।

ঘুমের সময়ও কি স্ক্রিনের দখলে?

একসময় রাত জাগার কারণ ছিল বই পড়া, গল্প করা কিংবা কোনো প্রয়োজনীয় কাজ। এখন অনেকের রাত জাগার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে স্ক্রিন। ‘আর পাঁচ মিনিট’ বলে ফোন হাতে নেওয়া হয়। একটি ভিডিও, একটি পোস্ট, একটি রিলস এভাবে কখন যে রাত গভীর হয়, তা অনেক সময় টের পাওয়া যায় না।

২০২৪ সালের একটি systematic review ও meta-analysis-এ ৫৫টি গবেষণা এবং ৪১,৭১৬ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে ইলেকট্রনিক মিডিয়া ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের মান কমে যাওয়া এবং ঘুম-সংক্রান্ত সমস্যার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে problematic smartphone use-এর সঙ্গে ঘুমের সমস্যার সম্পর্কও দেখা গেছে।

অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে ফোন ব্যবহার করলেই ঘুমের সমস্যা হবে। বরং অতিরিক্ত ও সমস্যাজনক ব্যবহারের ধরন নিয়ে সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সম্পর্কে তৈরি করে অদৃশ্য দূরত্ব:

স্মার্টফোন দূরের মানুষকে কাছে এনেছে। কিন্তু কখনো কখনো কাছের মানুষকে দূরে সরিয়েও দিয়েছে। একটি পরিবারের সবাই একই ঘরে বসে আছে। বাবা ফোন দেখছেন, মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত, সন্তান ভিডিও দেখছে। সবাই পাশাপাশি কিন্তু কথোপকথন নেই।

বন্ধুরা একসঙ্গে বসেছে। আড্ডার মাঝেও প্রত্যেকের হাতে ফোন। আমরা হয়তো পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তে যোগাযোগ করতে পারছি, কিন্তু পাশে বসা মানুষটির চোখের দিকে তাকিয়ে পাঁচ মিনিট কথা বলার সময় বের করতে পারছি না। এটি প্রযুক্তির ব্যর্থতা নয়; বরং ব্যবহারের ভারসাম্য হারানোর একটি সামাজিক চিত্র।

FOMO: অন্যরা এগিয়ে যাচ্ছে, আমি কি পিছিয়ে পড়ছি?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি পরিচিত ধারণা হলো FOMO (Fear of Missing Out)। অর্থাৎ অন্যরা কোনো কিছু উপভোগ করছে, অর্জন করছে বা কোনো ঘটনার অংশ হচ্ছে, অথচ আমি হয়তো সেটি থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছি এমন অনুভূতি।

কেউ ভ্রমণে গেছে, কেউ নতুন কিছু কিনেছে, কেউ সাফল্যের গল্প প্রকাশ করেছে, কেউ কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছে। আমরা তাদের জীবনের নির্বাচিত কয়েকটি মুহূর্ত দেখি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ সাধারণত জীবনের পুরো গল্প দেখায় না; দেখায় বেছে নেওয়া কিছু মুহূর্ত। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন অন্যের কয়েক সেকেন্ডের সাজানো দৃশ্যের সঙ্গে নিজের পুরো জীবনের তুলনা শুরু করি।

ফোন কাছে না থাকলেই অস্বস্তি কেন?

ফোন হারানো বা ফোন ব্যবহার করতে না পারার কারণে তীব্র অস্বস্তির প্রবণতাকে জনপ্রিয় ও গবেষণামূলক আলোচনায় ‘নোমোফোবিয়া’ নামে উল্লেখ করা হয়। তবে এটিকে সরাসরি একটি স্বীকৃত চিকিৎসাবিদ্যাগত রোগ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

মূল প্রশ্ন হলো আমাদের ফোন ব্যবহারের অভ্যাস কি স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বাধাগ্রস্ত করছে?

যদি ফোন ছাড়া কয়েক মিনিট থাকাও অসহ্য মনে হয়, কাজের সময় বারবার ফোন দেখতে হয়, ঘুমের সময়ও ফোন থেকে দূরে থাকা যায় না কিংবা পরিবার ও কাজের সময় ফোন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে তাহলে নিজের অভ্যাসটি নতুন করে মূল্যায়ন করার সময় এসেছে।

সমাধান:

ক. প্রযুক্তি নয়, নিয়ন্ত্রণ বদলাতে হবে।

স্মার্টফোনকে জীবন থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রয়োজন প্রযুক্তির সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা।

খ. নিজের Screen Time জানুন।

ফোনের Digital Wellbeing বা Screen Time ফিচারে গিয়ে প্রতিদিন কোন অ্যাপে কত সময় যাচ্ছে, তা দেখুন। অনেক সময় নিজের ব্যবহারের হিসাব দেখলেই বাস্তবতাটা পরিষ্কার হয়ে যায়।

গ. অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন।

প্রতিটি নোটিফিকেশন আমাদের মনোযোগের ওপর একটি ছোট দাবি তৈরি করে। প্রয়োজনীয় অ্যাপ ছাড়া বাকিগুলোর নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা যেতে পারে।

ঘ. ফোনমুক্ত কিছু সময় নির্ধারণ করুন।

খাবার টেবিল, পরিবারের সঙ্গে আড্ডা, গুরুত্বপূর্ণ আলাপ, পড়াশোনা এবং ঘুমের আগে কিছু সময় ফোন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস করা যেতে পারে।

ঙ. ঘুমের সময় ফোনকে বালিশের পাশে না রাখাই ভালো।

অ্যালার্মের প্রয়োজন হলে ফোন একটু দূরে রাখা যায়। এতে ঘুমানোর আগে অকারণ স্ক্রলিং এবং ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে ফোন হাতে নেওয়ার প্রবণতা দুটোই কমানো সম্ভব।

সবশেষে, ফোন হাতে নেওয়ার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন ‘আমি এখন ফোনটি কেন হাতে নিয়েছি?’

উত্তর যদি হয় ‘কাজ আছে’, তাহলে কাজটি শেষ করুন। আর যদি উত্তর হয় ‘এমনিই’, তাহলে হয়তো ফোনটি আবার রেখে দেওয়ার সময় হয়েছে।

নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

স্মার্টফোন আমাদের অতিরিক্ত সময় এনে দেবে না। প্রতিদিন আমাদের হাতে থাকবে সেই একই ২৪ ঘণ্টা। কিন্তু এই ২৪ ঘণ্টার কতটা আমরা কাজে, পরিবারে, পড়াশোনায়, ইবাদতে, বিশ্রামে কিংবা নিজের বিকাশে ব্যয় করব সেই সিদ্ধান্ত আমাদের। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করার জন্য এসেছে। তাই প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়া বা প্রত্যাখ্যান করা সমাধান নয়। সমাধান হলো প্রযুক্তিকে তার জায়গায় রাখা। স্মার্টফোন যেন আমাদের হাতিয়ার হয়, নিয়ন্ত্রক নয়।

কারণ সময় হারানোর কোনো শব্দ নেই। সময় চলে গেলে কোনো নোটিফিকেশন আসে না, কোনো সতর্কবার্তা দেখায় না, কোনো Undo বাটনও থাকে না। তাই রিলসের পর রিলস দেখতে দেখতে, স্ক্রিনে আঙুল চালাতে চালাতে আমাদের জীবনের মূল্যবান সময় যেন অদৃশ্য হয়ে না যায়।

স্মার্টফোন আমাদের জীবনকে সহজ করুক কিন্তু আমাদের জীবন যেন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আটকে না যায়।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!