লোডশেডিং শুরু হলেই ঘরের ফ্যান, লাইট, টিভি ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বর্তমানে ইন্টারনেট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় বিদ্যুৎ না থাকলেও অনেকেই Wi-Fi চালু রাখার চেষ্টা করেন। অনলাইন অফিস, ক্লাস, ফ্রিল্যান্সিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ভিডিও কল কিংবা জরুরি যোগাযোগের জন্য অনেকের কাছেই ইন্টারনেট সচল রাখা প্রয়োজন।
তবে বিদ্যুৎ চলে গেলে Wi-Fi রাউটার চালু রাখবেন নাকি বন্ধ করবেন, তা নির্ভর করে আপনার প্রয়োজন এবং রাউটার ও ইন্টারনেট সংযোগের পাওয়ার ব্যাকআপ ব্যবস্থার ওপর। শুধু রাউটার চালু থাকলেই যে বিদ্যুৎ না থাকার সময় ইন্টারনেট নিশ্চিতভাবে চলবে—এমনটিও নয়।
বিদ্যুৎ চলে গেলে রাউটার বন্ধ রাখবেন?
শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করলে, ইন্টারনেটের প্রয়োজন না থাকলে রাউটার বন্ধ করে রাখা যেতে পারে। তবে রাউটার এমন একটি যন্ত্র যা সাধারণভাবে দীর্ঘ সময় চালু রাখার জন্যই তৈরি। NETGEAR-এর সাপোর্ট নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তাদের রাউটারগুলো নিয়মিতভাবে সবসময় চালু থাকার জন্য ডিজাইন করা এবং ব্যবহার না করলেও রাউটার বন্ধ করার প্রয়োজন নেই।
তাই লোডশেডিংয়ের সময় যদি আপনার রাউটার UPS বা অন্য কোনো ব্যাকআপ পাওয়ারে সংযুক্ত থাকে এবং ইন্টারনেটের প্রয়োজন থাকে, তাহলে রাউটার চালু রাখাই যুক্তিযুক্ত।
শুধু রাউটার চালু রাখলেই কি ইন্টারনেট চলবে?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। অনেক বাসায় ফাইবার ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুধু Wi-Fi রাউটার নয়, ONT/ONU বা ফাইবার ডিভাইসও বিদ্যুৎ দিয়ে চালাতে হয়।
অর্থাৎ আপনার রাউটার UPS-এ চালু থাকলেও যদি ONT/ONU বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে Wi-Fi-এর নাম দেখা গেলেও ইন্টারনেট নাও থাকতে পারে। একইভাবে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারের স্থানীয় নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম বিদ্যুৎহীন হলে আপনার বাসার রাউটার চালু থাকলেও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে।
তাই লোডশেডিংয়ে ইন্টারনেট সচল রাখতে চাইলে রাউটার এবং প্রয়োজনীয় ONT/ONU—দুটোরই ব্যাকআপ পাওয়ার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
রাউটার চালু রাখলে কত বিদ্যুৎ খরচ হয়?
রাউটার সাধারণত ফ্রিজ, এসি বা কম্পিউটারের তুলনায় খুব কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। রাউটার ও ONT মিলিয়ে অনেক সাধারণ হোম সেটআপে বিদ্যুৎ খরচ কয়েক দশক ওয়াটের মধ্যে থাকতে পারে, যদিও প্রকৃত খরচ মডেলভেদে ভিন্ন হয়।
এ কারণে বিদ্যুৎ না থাকার সময় শুধু রাউটার চালু রাখার জন্য বড় ব্যাটারি ব্যাকআপের প্রয়োজন নাও হতে পারে। ছোট UPS বা উপযুক্ত DC Mini UPS দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম চালিয়ে রাখা সম্ভব।
তবে ব্যাকআপ কেনার আগে রাউটার ও ONT-এর অ্যাডাপ্টারে লেখা ভোল্টেজ ও অ্যাম্পিয়ার দেখে সঠিক ডিভাইস নির্বাচন করা জরুরি।
লোডশেডিংয়ে Wi-Fi চালু রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় কী?
যারা অনলাইন কাজ করেন, অনলাইন ক্লাস করেন বা নিয়মিত ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য রাউটার ও ONT-এর জন্য আলাদা ছোট UPS বা উপযুক্ত Mini UPS ব্যবহার করা কার্যকর সমাধান হতে পারে।
এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাউটার ও ONT দুটিই যেন ব্যাকআপ পাওয়ারের আওতায় থাকে। শুধু রাউটারকে ব্যাকআপ দিলে ONT বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ইন্টারনেট বন্ধ হতে পারে।
ব্যাকআপ ব্যবস্থাটি ইনস্টল করার পর একবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে পরীক্ষা করে দেখা ভালো যে রাউটার, ONT এবং ইন্টারনেট—সবকিছু ঠিকভাবে চালু থাকছে কি না।
বিদ্যুৎ না থাকলে Wi-Fi চালু রেখে লাভ কী?
লোডশেডিংয়ের সময় Wi-Fi চালু রাখতে পারলে মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের মোবাইল ডাটা ব্যবহার কমানো সম্ভব হতে পারে। ফলে মোবাইলের ব্যাটারিও কিছুটা সাশ্রয় করা যায়।
বিশেষ করে যারা বাসা থেকে অফিসের কাজ করেন, অনলাইন ক্লাস করেন, ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে জরুরি যোগাযোগ করেন, তাদের জন্য বিদ্যুৎ না থাকার সময় Wi-Fi সচল রাখা বেশ উপকারী হতে পারে।
এ ছাড়া IP camera, smart home device বা অন্য কোনো নেটওয়ার্ক-নির্ভর ডিভাইস থাকলে ইন্টারনেট সচল রাখা প্রয়োজন হতে পারে।
তবে প্রয়োজন না থাকলে বন্ধ রাখাও বুদ্ধিমানের কাজ
যদি লোডশেডিং দীর্ঘ হয় এবং আপনার ইন্টারনেটের কোনো প্রয়োজন না থাকে, তাহলে রাউটার ও ONT বন্ধ করে ব্যাকআপ ব্যাটারি সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
ধরুন, আপনার Mini UPS-এর ব্যাকআপ সীমিত। সামনে আরও কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় সারাক্ষণ Wi-Fi চালু রাখার পরিবর্তে প্রয়োজনের সময় চালু করা হলে ব্যাকআপ দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
অর্থাৎ রাউটার সবসময় চালু রাখতে হবে বা সবসময় বন্ধ রাখতে হবে—এমন কোনো একক নিয়ম নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো।
রাউটার চালু রেখেও ইন্টারনেট না থাকলে কী করবেন?
লোডশেডিংয়ের সময় রাউটার ও ONT চালু থাকার পরও ইন্টারনেট না থাকলে প্রথমে ONT-এর indicator light পরীক্ষা করুন। আপনার ISP-এর দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী PON, LOS বা Internet light-এর অবস্থা দেখে সমস্যাটি বোঝার চেষ্টা করতে পারেন।
যদি রাউটার চালু থাকে কিন্তু ফাইবার সিগন্যাল না থাকে, তাহলে সমস্যা আপনার বাসার রাউটারে নাও হতে পারে। ISP-এর স্থানীয় নেটওয়ার্ক বা বাইরের কোনো সরঞ্জাম বিদ্যুৎহীন থাকলেও এমন হতে পারে।
তাই এ অবস্থায় বারবার রাউটার বন্ধ-চালু না করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা এবং প্রয়োজনে ISP-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো।
পাওয়ার ব্যাংক দিয়ে রাউটার চালাবেন?
অনেকে সাধারণ মোবাইল পাওয়ার ব্যাংক দিয়ে রাউটার চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এটি সব রাউটারের জন্য সরাসরি নিরাপদ বা উপযুক্ত নয়। রাউটারের প্রয়োজনীয় ভোল্টেজ, কারেন্ট, কানেক্টর ও polarity-এর সঙ্গে পাওয়ার সোর্সের মিল থাকতে হবে। ভুল ভোল্টেজ ব্যবহার করলে রাউটার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই এ ক্ষেত্রে রাউটারের জন্য তৈরি উপযুক্ত DC Mini UPS অথবা প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী সামঞ্জস্যপূর্ণ UPS ব্যবহার করা নিরাপদ।
লোডশেডিংয়ে রাউটার ব্যবহারের ৫টি সহজ নিয়ম
প্রথমত, ইন্টারনেট প্রয়োজন হলে রাউটার বন্ধ করার দরকার নেই। দ্বিতীয়ত, রাউটারের পাশাপাশি ONT/ONU-ও ব্যাকআপে রাখুন। তৃতীয়ত, দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে প্রয়োজন না থাকলে রাউটার বন্ধ করে ব্যাকআপ সাশ্রয় করুন। চতুর্থত, ভুল ভোল্টেজের পাওয়ার ব্যাংক বা অ্যাডাপ্টার দিয়ে রাউটার চালাবেন না। পঞ্চমত, বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর সংযোগ স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় দিন।
শেষ কথা
লোডশেডিংয়ের সময় Wi-Fi রাউটার বন্ধ রাখবেন নাকি চালু রাখবেন—এর সহজ উত্তর হলো, ইন্টারনেট প্রয়োজন থাকলে এবং উপযুক্ত ব্যাকআপ পাওয়ার থাকলে চালু রাখতে পারেন। রাউটার নিজে সাধারণত দীর্ঘক্ষণ চালু থাকার জন্য তৈরি এবং বিদ্যুৎ খরচও তুলনামূলক কম।
তবে শুধু রাউটার চালু থাকলেই ইন্টারনেট চলবে না। ফাইবার সংযোগের ক্ষেত্রে ONT/ONU এবং ISP-এর নেটওয়ার্ক অবকাঠামোও সচল থাকতে হবে। তাই নিয়মিত লোডশেডিংয়ের এলাকায় যারা ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য রাউটার ও প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক ডিভাইসের উপযুক্ত ব্যাকআপ পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা কার্যকর প্রস্তুতি হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রয়োজন না থাকলে ব্যাকআপ শক্তি নষ্ট করবেন না, আর প্রয়োজন থাকলে সঠিক UPS দিয়ে রাউটার ও ONT দুটোকেই সচল রাখুন।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!