একটি বাড়ি শুধু ইট-পাথর, আসবাবপত্র ও অর্থ-সম্পদের সমষ্টি নয়। একটি পরিবারের প্রকৃত সুখ নির্ভর করে সেখানে শান্তি, ভালোবাসা, পারস্পরিক সম্মান এবং আল্লাহর স্মরণ কতটা রয়েছে তার ওপর। অনেক পরিবারে অর্থ, বাড়ি ও প্রয়োজনীয় সবকিছু থাকার পরও অশান্তি, ঝগড়া, দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা লেগেই থাকে। আবার কোনো পরিবারে সীমিত সামর্থ্য থাকলেও সেখানে ভালোবাসা, প্রশান্তি ও পারস্পরিক সম্মান দেখা যায়। ইসলামের ভাষায় আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ, প্রশান্তি ও উপকারকে বরকত বা রহমতের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেখা হয়। তাই বাড়িতে বরকত ও রহমত কামনা করলে শুধু বাহ্যিক সম্পদের দিকে নয়, পরিবারের আমল ও আচরণের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে সংকীর্ণ।” (সুরা ত্বহা: ১২৪)। এই আয়াত মানুষের জীবনে আল্লাহর স্মরণের গুরুত্ব বোঝায়। একটি বাড়িতে আল্লাহর স্মরণ, নামাজ ও কোরআনের পরিবেশ থাকলে পরিবারের সদস্যদের ঈমান ও আত্মিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে আল্লাহকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে শুধু দুনিয়াবি ব্যস্ততায় ডুবে থাকা মানুষের অন্তরে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বাড়িতে রহমত ও বরকত কমে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকা। যে বাড়িতে নামাজের ব্যাপারে কোনো গুরুত্ব নেই, কোরআন তিলাওয়াত হয় না, আল্লাহর নাম খুব কম উচ্চারিত হয় এবং পরিবারের সদস্যরা ইবাদতের পরিবর্তে সারাক্ষণ দুনিয়াবি ব্যস্ততায় নিমগ্ন থাকে, সেখানে আত্মিক প্রশান্তি কমে যেতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ঘরে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয় এবং যে ঘরে আল্লাহর নাম স্মরণ করা হয় না—দুটির উদাহরণ জীবিত ও মৃতের মতো। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)।
বাড়ির বরকতের সঙ্গে নামাজের সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ইসলামের ফরজ ইবাদত। পরিবারের সদস্যরা যদি নামাজের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েন, তাহলে এটি আত্মিক জীবনের জন্য বড় ক্ষতি। শুধু বাড়িতে নামাজ পড়ার স্থান থাকা যথেষ্ট নয়; পরিবারের প্রত্যেক সক্ষম সদস্যের নিজের ফরজ নামাজের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া জরুরি। বাবা-মা নিজেরা নামাজ আদায় করলে এবং সন্তানদেরও সুন্দরভাবে নামাজের প্রতি উৎসাহিত করলে বাড়িতে একটি ইবাদতময় পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
বাড়িতে রহমত ও বরকত কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে হারাম উপার্জন। মানুষের খাবার, পোশাক ও জীবনযাত্রার সঙ্গে তার উপার্জনের সম্পর্ক রয়েছে। ঘুষ, প্রতারণা, সুদ, চুরি, জালিয়াতি কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করে উপার্জিত অর্থ বাহ্যিকভাবে পরিবারের চাহিদা পূরণ করলেও তাতে বরকত থাকে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন। (সহিহ মুসলিম)। তাই পরিবারের জন্য হালাল রিজিকের চেষ্টা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঝগড়া, হিংসা ও অন্যায় আচরণও বাড়ির শান্তি নষ্ট করতে পারে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পরস্পরকে অপমান করা, সন্তানদের সঙ্গে কঠোর ও অন্যায় আচরণ করা, বাবা-মায়ের প্রতি অবহেলা করা কিংবা ভাই-বোনের মধ্যে হিংসা ও শত্রুতা—এসব আচরণ একটি বাড়ির পরিবেশকে অশান্ত করে তোলে। ইসলাম পরিবারে সদাচরণ ও পারস্পরিক দয়ার শিক্ষা দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে উত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।” (জামে তিরমিজি)।
বাড়িতে গিবত, অপবাদ, চোগলখুরি ও অশ্লীল কথাবার্তা চলতে থাকাও আত্মিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কোরআনে আল্লাহ গিবতকে অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পরিবারের সদস্যরা যদি একে অন্যের বিরুদ্ধে কথা বলেন, বাইরের মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন বা একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগিয়ে দেন, তাহলে পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়। বিশেষ করে শিশুদের সামনে এমন কথাবার্তা তাদের আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান সময়ে আরও একটি বিষয় পরিবারের পরিবেশে বড় প্রভাব ফেলছে—অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ও বিনোদন ব্যবহার। মোবাইল বা ইন্টারনেট ব্যবহার নিজে হারাম নয়। কিন্তু যদি এর মাধ্যমে অশ্লীলতা, গুনাহ, মিথ্যা, পরনিন্দা বা অনৈতিক বিষয় ঘরে প্রবেশ করে এবং পরিবারের সদস্যরা একে অন্যের সঙ্গে কথা বলার সময় না পান, তাহলে পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারেও ইসলামী সীমারেখা ও আত্মসংযম জরুরি।
বাড়িতে কোরআন তিলাওয়াতের পরিবেশ না থাকাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোরআন মানুষের হেদায়েত ও অন্তরের প্রশান্তির গ্রন্থ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আমি কোরআন নাজিল করেছি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত।” (সুরা ইসরা: ৮২)। তাই নিয়মিত কোরআন পড়া, শোনা এবং তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করা পরিবারের ঈমানি পরিবেশকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
বাড়িতে প্রবেশের সময় এবং খাবার শুরু করার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি ঘরে প্রবেশের সময় এবং খাবার খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করলে শয়তান বলে, “আজ তোমাদের এখানে রাত কাটানোর ও খাবারের কোনো সুযোগ নেই।” (সহিহ মুসলিম)। তাই ঘরে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ বলা এবং খাবারের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া খুব সহজ একটি সুন্নত, যা প্রতিদিন পালন করা যায়।
বাড়িতে প্রবেশের সময় নির্দিষ্ট একটি মাসনুন দোয়াও পড়া যায়—
بِسْمِ اللَّهِ وَلَجْنَا، وَبِسْمِ اللَّهِ خَرَجْنَا، وَعَلَى اللَّهِ رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا
বাংলা উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়ালাজনা, ওয়া বিসমিল্লাহি খারাজনা, ওয়া আলাল্লাহি রব্বিনা তাওয়াক্কালনা।
অর্থ: আল্লাহর নামে আমরা প্রবেশ করলাম, আল্লাহর নামেই আমরা বের হলাম এবং আমাদের প্রতিপালক আল্লাহর ওপরই আমরা ভরসা করলাম।
এই দোয়াটি ঘরে প্রবেশের সময় পড়ার বিষয়ে আবু দাউদে একটি বর্ণনা রয়েছে। তবে দোয়াটিকে এমন কোনো যান্ত্রিক আমল হিসেবে দেখা উচিত নয় যে শুধু পড়লেই বাড়ির সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে। বরং এটি আল্লাহকে স্মরণ করে ঘরে প্রবেশ করার একটি সুন্নত আদব।
বাড়িতে রহমত ও বরকতের জন্য অতিথি, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের প্রতি ভালো আচরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, প্রতিবেশীর অধিকার এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ওপর অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি পরিবার যখন শুধু নিজেদের জন্য নয়, অন্য মানুষের কল্যাণের কথাও চিন্তা করে, তখন সমাজের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সুন্দর হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়।
বাবা-মায়ের প্রতি সদাচরণও পরিবারের বরকতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করা, তাদের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা বা তাদের কষ্ট দেওয়া থেকে অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদের সঙ্গে “উফ” পর্যন্ত না বলতে বলেছেন। (সুরা ইসরা: ২৩)। তাই একটি পরিবারের ছোট-বড় সবারই উচিত বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা এবং তাদের অধিকার আদায় করা।
তবে “বাড়িতে রহমত আসে না” কথাটিকে এমনভাবে বোঝা উচিত নয় যে কোনো একটি নির্দিষ্ট বস্তু, ছবি, শব্দ বা সাধারণ পার্থিব ঘটনার কারণে নিশ্চিতভাবে আল্লাহর রহমত বন্ধ হয়ে গেছে। ইসলামী বিষয়ে এ ধরনের অপ্রমাণিত ধারণা ছড়ানো ঠিক নয়। বরং কোরআন ও সহিহ হাদিসে যেসব আমল, গুনাহ ও আচরণের ব্যাপারে নির্দেশনা এসেছে, সেগুলোকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
একটি পরিবার চাইলে আজ থেকেই কয়েকটি সহজ অভ্যাস শুরু করতে পারে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, প্রতিদিন কিছু সময় কোরআন তিলাওয়াত করা, ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহকে স্মরণ করা, খাবারের আগে বিসমিল্লাহ বলা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা, গিবত ও অশ্লীল কথাবার্তা এড়িয়ে চলা, হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা এবং নিয়মিত আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত প্রার্থনা করা—এসবের মাধ্যমে একটি সুন্দর ইসলামি পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, বাড়িতে বরকত মানে শুধু বেশি টাকা, বড় বাড়ি বা বাহ্যিক আরাম নয়। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা, হালাল রিজিক, সুস্থতা, নিরাপত্তা, ইবাদতের সুযোগ এবং অন্তরের প্রশান্তিও আল্লাহর বড় নিয়ামত। তাই রহমত ও বরকত কামনা করতে হলে আল্লাহর আনুগত্যের পাশাপাশি পরিবারের মানুষের অধিকারও যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
বাড়িতে আল্লাহর স্মরণ, নামাজ, কোরআন, হালাল উপার্জন ও পারিবারিক সদাচরণের পরিবেশ তৈরি করুন। গুনাহ, অন্যায়, গিবত, চোগলখুরি ও মানুষের হক নষ্ট করা থেকে বেঁচে থাকুন। আল্লাহর রহমত ও বরকত পাওয়ার জন্য দোয়া করার পাশাপাশি নিজের জীবন ও পরিবারের পরিবেশও কোরআন-সুন্নতের আলোকে সংশোধন করুন।|
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!