পুরোনো স্মার্টফোন ব্যবহার করতে করতে একসময় দেখা যায়, আগের মতো দ্রুত কাজ করছে না। অ্যাপ খুলতে সময় লাগছে, কিবোর্ডে টাইপ করার সময় ল্যাগ করছে, ক্যামেরা চালু হতে দেরি হচ্ছে কিংবা এক অ্যাপ থেকে অন্য অ্যাপে গেলে ফোন আটকে যাচ্ছে। অনেকেই এমন পরিস্থিতিতে ধরে নেন, ফোনের বয়স হয়ে গেছে, তাই নতুন ফোন কেনা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

কিন্তু সব সময় এমনটা নয়। ফোন ধীর হওয়ার পেছনে স্টোরেজ প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়া, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ, পুরোনো সফটওয়্যার, ব্যাকগ্রাউন্ডে অতিরিক্ত কার্যক্রম, ক্যাশ ও দীর্ঘদিন রিস্টার্ট না করার মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই নতুন ফোন কেনার আগে কয়েকটি সহজ কাজ করে দেখলে অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ফোনের পারফরম্যান্স কিছুটা উন্নত করা সম্ভব।

প্রথমেই ফোনের স্টোরেজ পরীক্ষা করুন

পুরোনো ফোন ধীর হওয়ার অন্যতম সাধারণ কারণ হলো স্টোরেজ প্রায় পূর্ণ হয়ে যাওয়া। ফোনের স্টোরেজে ছবি, ভিডিও, ডাউনলোড করা ফাইল, অ্যাপ এবং বিভিন্ন অ্যাপের ডাটা জমতে জমতে একসময় খালি জায়গা খুব কমে যায়।

বিশেষ করে WhatsApp, Messenger, Facebook, TikTok বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে আসা ছবি ও ভিডিও দীর্ঘদিন জমে থাকলে স্টোরেজ দ্রুত পূর্ণ হতে পারে।

তাই Settings-এর Storage বিভাগে গিয়ে ফোনে কতটুকু জায়গা খালি রয়েছে তা প্রথমে দেখুন। অপ্রয়োজনীয় বড় ভিডিও, ডুপ্লিকেট ছবি, পুরোনো ডাউনলোড এবং ব্যবহার না করা ফাইল মুছে ফেলুন।

Google Photos, iCloud বা অন্য কোনো বিশ্বস্ত ক্লাউড সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ছবি-ভিডিও ব্যাকআপ নিয়ে তারপর ফোন থেকে অপ্রয়োজনীয় ফাইল সরিয়ে ফেলা যেতে পারে।

ব্যবহার করেন না এমন অ্যাপ মুছে ফেলুন

অনেক ফোনে এমন অসংখ্য অ্যাপ থাকে যেগুলো মাসের পর মাস ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু কিছু অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে কার্যক্রম চালাতে পারে, নোটিফিকেশন পাঠাতে পারে বা স্টোরেজ দখল করে রাখতে পারে।

তাই অ্যাপের তালিকা একবার ভালোভাবে দেখে নিন। গত কয়েক মাসে ব্যবহার করেননি এমন অ্যাপ থাকলে সেটি সত্যিই দরকার কি না ভাবুন।

Android ও iPhone উভয় প্ল্যাটফর্মেই অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ সরিয়ে ফেলা যায়। তবে কোনো অ্যাপ মুছে ফেলার আগে সেটিতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ডকুমেন্ট সংরক্ষিত আছে কি না নিশ্চিত হওয়া উচিত।

বিশেষ করে সন্দেহজনক বা অচেনা অ্যাপ থাকলে সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করুন।

ফোনের সফটওয়্যার আপডেট আছে কি না দেখুন

পুরোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করলেও ফোনের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। নির্মাতারা নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেটের মাধ্যমে নিরাপত্তা উন্নত করার পাশাপাশি বিভিন্ন বাগ ও পারফরম্যান্স সমস্যা ঠিক করে থাকে।

তাই Settings-এর Software Update বা System Update বিভাগে গিয়ে কোনো আপডেট পাওয়া যাচ্ছে কি না দেখুন।

তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—সব পুরোনো ফোনে সর্বশেষ অপারেটিং সিস্টেম আপডেট পাওয়া যাবে না। ফোনের মডেল ও নির্মাতার সফটওয়্যার সাপোর্টের ওপর এটি নির্ভর করে।

ফোন একবার রিস্টার্ট করুন

এটি খুব সাধারণ একটি কাজ হলেও অনেক ব্যবহারকারী দীর্ঘদিন ফোন রিস্টার্ট করেন না।

ফোনে বিভিন্ন অ্যাপ ও সিস্টেম প্রক্রিয়া চলতে চলতে সাময়িক মেমোরি ব্যবহার করে। দীর্ঘ সময় ফোন চালু থাকার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছোটখাটো সফটওয়্যার সমস্যা বা অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিতে পারে।

এ কারণে ফোন ধীর মনে হলে প্রথমেই একবার রিস্টার্ট করে দেখুন। রিস্টার্টের পর যদি ফোনের পারফরম্যান্স সাময়িকভাবে উন্নত হয়, তাহলে সমস্যাটি সফটওয়্যার বা চলমান প্রসেসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

কোন অ্যাপ বেশি ব্যাটারি ও রিসোর্স ব্যবহার করছে দেখুন

ফোনের Settings-এর Battery বা Battery Usage বিভাগে গেলে সাধারণত কোন অ্যাপ কতটা ব্যাটারি ব্যবহার করছে তা দেখা যায়।

কোনো অ্যাপ অস্বাভাবিকভাবে বেশি ব্যাটারি ব্যবহার করলে সেটি ফোনের পারফরম্যান্সেও প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে কোনো অ্যাপ ব্যাকগ্রাউন্ডে অতিরিক্ত কার্যক্রম চালালে সেটির ব্যবহার সীমিত করার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ মেসেজিং, ই-মেইল বা সিস্টেম অ্যাপের ব্যাকগ্রাউন্ড কার্যক্রম বন্ধ করার আগে সতর্ক থাকতে হবে। এতে নোটিফিকেশন বা কিছু ফিচার ঠিকমতো কাজ নাও করতে পারে।

ব্রাউজারের অপ্রয়োজনীয় ডাটা পরিষ্কার করুন

ফোনের ব্রাউজার দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে ক্যাশ, কুকি ও অন্যান্য ব্রাউজিং ডাটা জমতে পারে। যদিও এসব ডাটা সব সময় ফোন ধীর হওয়ার প্রধান কারণ নয়, তবু ব্রাউজারে সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যাশ পরিষ্কার করা যেতে পারে।

তবে ব্রাউজারের সব ডাটা মুছে ফেলার আগে সতর্ক থাকুন। কিছু ক্ষেত্রে সংরক্ষিত লগইন বা ওয়েবসাইটের পছন্দের তথ্য হারিয়ে যেতে পারে।

তাই শুধু সমস্যাযুক্ত ব্রাউজারের প্রয়োজনীয় ডাটা পরিষ্কার করাই ভালো।

হোমস্ক্রিন ও উইজেট কমিয়ে দেখুন

পুরোনো বা কম শক্তিশালী ফোনে অতিরিক্ত উইজেট, লাইভ ওয়ালপেপার এবং বিভিন্ন ধরনের অ্যানিমেশন ব্যবহার করলে সিস্টেমের ওপর কিছুটা অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।

তাই ফোন ধীর হলে হোমস্ক্রিনে থাকা অপ্রয়োজনীয় উইজেট সরিয়ে ফেলুন। লাইভ ওয়ালপেপারের পরিবর্তে সাধারণ ওয়ালপেপার ব্যবহার করে দেখতে পারেন।

কিছু Android ফোনে অ্যানিমেশন কমানোর মতো অপশনও থাকে। তবে সেটিংসের নাম ফোনের ব্র্যান্ড ও সফটওয়্যার সংস্করণ অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

ফোন অতিরিক্ত গরম হচ্ছে কি না দেখুন

ফোনের তাপমাত্রাও পারফরম্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময় গেম খেলা, ভিডিও রেকর্ডিং, চার্জে রেখে ভারী অ্যাপ ব্যবহার অথবা গরম পরিবেশে ফোন চালানোর কারণে ডিভাইসের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

অনেক স্মার্টফোন অতিরিক্ত গরম হলে নিজে থেকেই পারফরম্যান্স কমিয়ে দিতে পারে, যাতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে ফোন সাময়িকভাবে ধীর মনে হতে পারে।

তাই ফোন অস্বাভাবিক গরম হলে কিছু সময় ব্যবহার বন্ধ করে ঠান্ডা হতে দিন। ফোনকে সরাসরি রোদে বা অতিরিক্ত গরম জায়গায় রাখবেন না।

ব্যাটারির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন

পুরোনো ফোন ধীর হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাটারির অবস্থাও বিবেচনা করা দরকার। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি স্বাভাবিকভাবেই তার ধারণক্ষমতা হারায়।

কিছু ফোনে Battery Health বা Battery Capacity দেখার সুবিধা রয়েছে। আবার কিছু Android ফোনে নির্মাতা ও মডেল অনুযায়ী ব্যাটারি ব্যবহারের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।

যদি ফোনের ব্যাটারি খুব দ্রুত শেষ হয়, হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় বা অস্বাভাবিক গরম হয়, তাহলে শুধু ফোন ধীর হওয়ার কারণে নতুন ডিভাইস কেনার আগে ব্যাটারি পরীক্ষা করানো যেতে পারে।

শেষ উপায় হিসেবে ব্যাকআপ নিয়ে Factory Reset

উপরের সবকিছু করার পরও যদি ফোন অস্বাভাবিক ধীর থাকে এবং সফটওয়্যার সমস্যার সন্দেহ হয়, তাহলে Factory Reset বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে এটি করার আগে অবশ্যই ছবি, ভিডিও, পরিচিতি, গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট, WhatsApp-এর প্রয়োজনীয় ব্যাকআপ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে। Factory Reset ফোনের অভ্যন্তরীণ ডাটা মুছে দিতে পারে।

ফোন রিসেট করার পরও যদি একই ধরনের সমস্যা থাকে, তাহলে হার্ডওয়্যার বা ব্যাটারি-সংক্রান্ত সমস্যা থাকতে পারে।

কখন নতুন ফোন কেনার কথা ভাববেন?

স্টোরেজ খালি করা, অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ সরানো, সফটওয়্যার আপডেট, রিস্টার্ট এবং প্রয়োজনীয় সেটিংস পরিবর্তনের পরও যদি ফোন নিয়মিত হ্যাং করে, অ্যাপ ক্র্যাশ করে, ব্যাটারি খুব দ্রুত শেষ হয় বা নতুন অ্যাপ চালাতে সমস্যা হয়, তখন নতুন ফোন কেনার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

বিশেষ করে ফোন যদি আর নিরাপত্তা আপডেট না পায় এবং আপনার দৈনন্দিন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাপগুলো ঠিকভাবে চালাতে না পারে, তখন পুরোনো ডিভাইস পরিবর্তনের যৌক্তিক কারণ তৈরি হয়।

তবে শুধু ফোন কয়েক বছরের পুরোনো হয়েছে বলেই নতুন ফোন কেনা জরুরি নয়। প্রথমে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করুন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন। অনেক ক্ষেত্রে কয়েকটি সঠিক পরিবর্তনেই পুরোনো স্মার্টফোন আবার আগের তুলনায় বেশ ভালোভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!