বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তি। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় তার নামে। তবে বাংলাদেশের সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও সরকারপ্রধান নন। সরকারের নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্র প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা।

সম্প্রতি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত ভোটে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ছয়জন সংসদ সদস্য ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন।

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট প্রার্থী দেওয়ায় দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনের পর অনেকের আগ্রহ তৈরি হয়েছে—বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু এবং তিনি কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান।

রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। তবে সংসদীয় ব্যবস্থায় তার অধিকাংশ ক্ষমতা আনুষ্ঠানিক। সাধারণত রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়।

তবে দুটি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং অন্যটি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে সাধারণত সেই দলের সংসদীয় নেতাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। তবে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির স্বাধীন সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখেন। রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য পাঠাতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করেন।

দণ্ড মওকুফের ক্ষমতা

রাষ্ট্রপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হলো দণ্ড মার্জনা, স্থগিত, হ্রাস বা মওকুফ করার ক্ষমতা।

সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কর্তৃপক্ষের দেওয়া সাজা নির্দিষ্ট সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রপতি কমাতে বা মওকুফ করতে পারেন।

রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক দায়মুক্তি রয়েছে। দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। তাকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালত থেকে পরোয়ানাও জারি করা যায় না।

তবে রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণভাবে অপসারণের বাইরে নন। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাকে অভিশংসন করা যেতে পারে।

রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাক্ষরযুক্ত অভিযোগ স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়। পরে সংসদের মোট সদস্যের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব পাস হলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হতে পারে।

রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ও নির্বাচনের পদ্ধতি

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। জাতীয় সংসদের সদস্যরা তাকে নির্বাচিত করেন।

একজন সংসদ সদস্য কোনো প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেন এবং অন্য একজন তা সমর্থন করেন। একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে সর্বাধিক ভোট পাওয়া ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

সমান ভোট হলে সংবিধান অনুযায়ী লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।

রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। তবে উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি পদে বহাল থাকতে পারেন। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য ন্যূনতম বয়স ৩৫ বছর হতে হয় এবং সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হয়।

রাষ্ট্রপতির বেতন ও আর্থিক সুবিধা

রাষ্ট্রপতির বেতন ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারিত হয়েছে সংশ্লিষ্ট আইনের মাধ্যমে। বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই বেতন আয়করমুক্ত।

রাষ্ট্রপতির জন্য বার্ষিক আপ্যায়ন ভাতার ব্যবস্থাও রয়েছে। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের জন্য রয়েছে সরকারি বিভিন্ন সুবিধা।

বঙ্গভবন, গাড়ি ও চিকিৎসা সুবিধা

রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন। এর রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় ব্যয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়।

রাষ্ট্রপতিকে সরকারি দায়িত্ব পালনের জন্য গাড়ি ও প্রয়োজনীয় পরিবহন সুবিধা দেওয়া হয়। বিদেশ সফরের সময় সরকার নির্ধারিত হারে ভাতা পান তিনি।

রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ সুবিধা রয়েছে। দেশের যেকোনো হাসপাতালে তারা বিনা খরচে চিকিৎসা নিতে পারেন। প্রয়োজন হলে বিদেশে চিকিৎসার ব্যয়ও সরকার বহন করে।

রাষ্ট্রপতির বিমানভ্রমণের জন্য নির্ধারিত বিমা সুবিধাও রয়েছে।

রাষ্ট্রপতির স্বেচ্ছাধীন তহবিল

রাষ্ট্রপতির জন্য একটি স্বেচ্ছাধীন তহবিল রয়েছে। এই অর্থ রাষ্ট্রপতির বিবেচনায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা যায়।

সাবেক রাষ্ট্রপতির সুবিধা

রাষ্ট্রপতি পদ ছাড়ার পরও সাবেক রাষ্ট্রপতির জন্য কিছু সরকারি সুবিধা বহাল থাকে। তবে এসব সুবিধা নির্ধারিত আইন ও নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হয়।

রাষ্ট্রপ্রধান, কিন্তু সরকারপ্রধান নন

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মর্যাদা ও সাংবিধানিক গুরুত্বের দিক থেকে দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি হলেও তিনি সরকারের প্রধান নন।

সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে থাকে। ফলে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা মূলত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন, রাষ্ট্রীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করা এবং সংবিধানের নির্ধারিত দায়িত্ব সম্পন্ন করা।

তবে কোনো নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ তাই একদিকে যেমন সর্বোচ্চ মর্যাদার, অন্যদিকে সংসদীয় ব্যবস্থার কারণে তার কার্যকর নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!