দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকার পর হঠাৎ বিদ্যুৎ ফিরে আসে। তখন স্বাভাবিকভাবেই বাসাবাড়িতে ফ্যান, ফ্রিজ, এসি, টিভি, কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালু করার তাড়া থাকে। কিন্তু বিদ্যুৎ আসার সঙ্গে সঙ্গে একসঙ্গে সব যন্ত্র চালু করা বা অস্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্যেই ফ্রিজ ও এসি চালু করে দেওয়া ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বিশেষ করে বিদ্যুৎ বারবার আসা-যাওয়া করলে ভোল্টেজ ওঠানামা বা পাওয়ার সার্জের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। Samsung-এর বাংলাদেশি সাপোর্ট নির্দেশনায়ও ফ্রিজের জন্য স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহের গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা বা অস্থিতিশীল সরবরাহে কুলিং কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
তাই লোডশেডিংয়ের পর বিদ্যুৎ ফিরে এলে তাড়াহুড়া না করে কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরি।
বিদ্যুৎ আসার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজ চালু করা কি ঠিক?
ফ্রিজের কম্প্রেসর চালু হওয়ার সময় তুলনামূলক বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। বিদ্যুৎ ফিরে আসার মুহূর্তে যদি সরবরাহ স্থিতিশীল না থাকে বা আবার দ্রুত বিদ্যুৎ চলে যায়, তাহলে ফ্রিজের বৈদ্যুতিক ও কম্প্রেসর সিস্টেমে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
Samsung-এর তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা ‘ব্রাউনআউট’-এর পর পাওয়ার ঠিকভাবে ফিরে না এলে ফ্রিজের ইলেকট্রনিক সিস্টেমে সমস্যা হতে পারে। কিছু মডেলে এমন পরিস্থিতিতে পুনরায় সংযোগ দেওয়ার আগে ৩০ সেকেন্ড অপেক্ষা করার নির্দেশনাও রয়েছে। তবে এটি মডেলভেদে আলাদা হতে পারে।
এ কারণে সবার জন্য নির্দিষ্ট করে ‘ঠিক এত মিনিট অপেক্ষা করতেই হবে’ বলা ঠিক নয়। আপনার ফ্রিজের ব্যবহারবিধিতে যে নির্দেশনা দেওয়া আছে, সেটিই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
এসির ক্ষেত্রে কেন বাড়তি সতর্কতা দরকার?
এসি চালানোর সময় কম্প্রেসর বড় ধরনের বৈদ্যুতিক লোড নেয়। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর খুব দ্রুত কম্প্রেসর পুনরায় চালু হলে সিস্টেমের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
আধুনিক অনেক এসিতে এই সমস্যা এড়াতে স্বয়ংক্রিয় কম্প্রেসর ডিলে বা টাইম-ডিলে প্রটেকশন থাকে। উদাহরণ হিসেবে Samsung-এর তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর তাদের কিছু এসি কম্প্রেসর পুনরায় চালু করতে প্রায় ৩ মিনিট সময় নেয়। Carrier-এর তথ্যেও আধুনিক থার্মোস্ট্যাটে সাধারণত ৩–৫ মিনিটের কম্প্রেসর ডিলে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে খুব দ্রুত পুনরায় চালু হওয়ার কারণে কম্প্রেসরের ওপর চাপ না পড়ে।
তাই বিদ্যুৎ ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে এসি চালু না করে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করা নিরাপদ অভ্যাস হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিজের এসির মডেলের নির্দেশিকা অনুসরণ করাই সবচেয়ে ভালো।
বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপদ কী?
লোডশেডিংয়ের সময় শুধু বিদ্যুৎ না থাকাই সমস্যা নয়। বিদ্যুৎ ফিরে আসার সময় যদি ভোল্টেজ অস্বাভাবিকভাবে কম-বেশি হয়, তাহলে যন্ত্রপাতির ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
Samsung-এর তথ্য অনুযায়ী, পাওয়ার সার্জ বা অন্য কোনো বৈদ্যুতিক অস্বাভাবিকতার কারণে ফ্রিজে কম্প্রেসর-সংক্রান্ত ত্রুটি দেখা দিতে পারে। তাদের কিছু মডেলে অতিরিক্ত ভোল্টেজ ও কম ভোল্টেজের জন্য আলাদা ত্রুটি সংকেতও রয়েছে।
তাই এলাকায় যদি বিদ্যুৎ ঘন ঘন আসা-যাওয়া করে বা বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর আলো অস্বাভাবিকভাবে কম-বেশি হতে দেখা যায়, তখন ফ্রিজ বা এসি চালু করার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক হওয়া উচিত।
বিদ্যুৎ ফিরে এলে প্রথমে কী করবেন?
প্রথমে ঘরের কয়েকটি সাধারণ বাতি বা অপেক্ষাকৃত কম লোডের যন্ত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক আছে কি না খেয়াল করুন। যদি বারবার বিদ্যুৎ চলে যায়, তাহলে ফ্রিজ-এসি চালু করার তাড়া না দেওয়াই ভালো।
বিদ্যুৎ স্থিতিশীল মনে হলে প্রয়োজনীয় যন্ত্রগুলো একসঙ্গে না চালিয়ে ধীরে ধীরে চালু করা যেতে পারে। বিশেষ করে ফ্রিজ, এসি, পানির পাম্প ও অন্যান্য উচ্চক্ষমতার যন্ত্র একই সময়ে চালু করলে বৈদ্যুতিক লাইনে বাড়তি লোড তৈরি হতে পারে।
Samsung Bangladesh ফ্রিজের ক্ষেত্রে স্থিতিশীল 230V/50Hz বিদ্যুৎ সরবরাহ, সঠিক গ্রাউন্ডিং এবং সকেটে অতিরিক্ত লোড না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
ফ্রিজের দরজা বারবার খুলবেন না
লোডশেডিংয়ের সময় ফ্রিজের দরজা বারবার খোলা যেমন খাবারের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি বিদ্যুৎ ফিরে আসার আগ পর্যন্ত অপ্রয়োজনীয়ভাবে ফ্রিজের ভেতর হাতড়ানোও ঠিক নয়।
বিদ্যুৎ চলে গেলে দরজা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখুন। বিদ্যুৎ ফিরে আসার পরও ফ্রিজ স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হতে কিছুটা সময় নিতে পারে। তাই সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে খাবারের অবস্থা পরীক্ষা করার পরিবর্তে প্রয়োজন ছাড়া দরজা না খোলাই ভালো।
এসি চালুর আগে কী কী দেখবেন?
বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর এসি চালানোর আগে নিশ্চিত করুন যে ঘরের বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল। যদি বিদ্যুৎ আবার চলে যায় বা ভোল্টেজ নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে এসি বন্ধ রাখুন।
এসি থেকে পোড়া গন্ধ, অস্বাভাবিক শব্দ, বারবার সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করা বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সেটি চালু করার চেষ্টা না করে দক্ষ টেকনিশিয়ানের সহায়তা নেওয়া উচিত। Carrier-ও অস্বাভাবিক শব্দ, পোড়া গন্ধ বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক সমস্যার লক্ষণ দেখা দিলে এসি বন্ধ রেখে পেশাদারের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেছে।
স্ট্যাবিলাইজার বা সার্জ প্রটেক্টর কি দরকার?
এটি পুরোপুরি আপনার এলাকার বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও যন্ত্রের মডেলের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে ভোল্টেজ নিয়মিত ওঠানামা করলে উপযুক্ত ভোল্টেজ সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে।
Samsung-এর তথ্য অনুযায়ী, ভোল্টেজের ওঠানামা থেকে এসিকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী ভোল্টেজ স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে এবং এর প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে পেশাদার ইলেকট্রিশিয়ানের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তবে বাজারের যেকোনো স্ট্যাবিলাইজার কিনে ব্যবহার না করে এসির ক্ষমতা, ভোল্টেজ রেঞ্জ এবং প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী উপযুক্ত ডিভাইস নির্বাচন করা জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
লোডশেডিংয়ের পর বিদ্যুৎ আসার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজ-এসি চালু করলেই নিশ্চিতভাবে নষ্ট হয়ে যাবে—এমন নয়। আধুনিক অনেক যন্ত্রেই সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু বিদ্যুৎ যদি অস্থিতিশীল থাকে, বারবার আসা-যাওয়া করে বা পাওয়ার সার্জ হয়, তাহলে ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তাই মূল বিষয় হলো বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর সরবরাহ স্থিতিশীল কি না দেখা এবং যন্ত্রের নিজস্ব সুরক্ষা ব্যবস্থা ও প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুসরণ করা।
শেষ কথা
বর্তমান লোডশেডিং পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর যেমন ধৈর্য ধরতে হবে, তেমনি বিদ্যুৎ ফিরে এলেও তাড়াহুড়া করা যাবে না। বিশেষ করে ফ্রিজ ও এসির মতো কম্প্রেসরচালিত যন্ত্র চালুর ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ ফিরে এলে প্রথমে সরবরাহ স্থিতিশীল কি না দেখুন। এরপর প্রয়োজনীয় যন্ত্রগুলো ধীরে ধীরে চালু করুন। এসির ক্ষেত্রে কম্প্রেসর ডিলে থাকলে সেটিকে কাজ করার সুযোগ দিন। আর ভোল্টেজ অস্বাভাবিক মনে হলে ফ্রিজ-এসি চালু না করে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—বিদ্যুৎ আসা মানেই সঙ্গে সঙ্গে সব যন্ত্র চালু করা নয়; স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই আগে। এতে দামি বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির সম্ভাব্য ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!