ব্রাজিলের সাবেক তারকা ফুটবলার ও রিয়াল মাদ্রিদ কিংবদন্তি রবার্তো কার্লোস, যিনি ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন, সম্প্রতি নিজেকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া এক গুজব নিয়ে মুখ খুলেছেন। গুজবে দাবি করা হচ্ছিল যে তিনি ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছেন। এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে সৌদি সংবাদপত্র ‘ওকাজ’কে তিনি বলেন, “আমি ইসলামের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল, এবং আমার স্ত্রীকে নামাজ পড়তে দেখা দারুণ ব্যাপার, কিন্তু আমার ইসলাম ধর্মান্তরিত হওয়া নিয়ে যে গুজব ছড়াচ্ছে তা সত্য নয়।”
এই গুজবের সূত্রপাত ঘটে তুরস্কের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে, যার মধ্যে হাবেরলার অন্যতম। সেসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ৫৩ বছর বয়সী কার্লোস প্রায় চার সপ্তাহ আগে ব্রাজিলের মুসলিম সম্প্রদায়ের পরিচিত ব্যক্তিত্ব শেখ জিহাদ হামাদার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় শাহাদা পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তুরস্কের ক্ষমতাসীন দলের এমপি আলী শাহিন এই দাবি সামনে আনেন, যিনি সাও পাওলোতে ব্রাজিলের মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর এই তথ্য জানতে পারার কথা বলেন। শেখ হামাদা তাকে জানান, কার্লোস দীর্ঘদিন ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন এবং প্রায় চার সপ্তাহ আগে তার সঙ্গে দেখা করে ধর্ম বিষয়ে শিখেছেন, এরপর শাহাদা পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। এই সংবাদ শোনার পর শাহিন কার্লোস ও তার পরিবারের জন্য শান্তি, স্বাস্থ্য ও কল্যাণের কামনা করেন।
এই গুজবে আরও ইন্ধন জোগায় কার্লোসের বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি, যাতে একটি ইসলামিক বিবাহ অনুষ্ঠানের মতো দৃশ্য দেখা যায়। ছবিগুলোতে মরক্কোর ফুটবল এজেন্ট সুহাইলা এল-তাহিরির সঙ্গে কার্লোসের বিবাহ চুক্তিতে স্বাক্ষর করার দৃশ্য দেখা যায়, যা সামাজিক যোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জল্পনা আরও বাড়িয়ে দেয়। সুহাইলা ফিফা-স্বীকৃত একজন খেলোয়াড় এজেন্ট, যিনি খেলোয়াড়দের পেশাগত ক্যারিয়ার এবং ফুটবল সম্পর্কিত প্রকল্প পরিচালনায় যুক্ত।
কার্লোস ব্যাখ্যা করেন, তার এবং সুহাইলার বিয়ে একাধিক আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল, যাতে দুই পরিবারের ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসকে সম্মান জানানো যায়। তিনি জানান, তার পরিবারের ক্যাথলিক বিশ্বাস অনুসরণকারী সদস্যদের জন্য একটি রীতি এবং তার মুসলিম স্ত্রী ও তাদের মুসলিম বন্ধুদের জন্য আরেকটি রীতি আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি স্পষ্টভাবে জোর দিয়ে বলেন যে এই আন্তঃধর্মীয় উদযাপন তার নিজের ধর্ম পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত বহন করে না — বরং এটি ছিল দুই পরিবারের ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি প্রয়াস।
এছাড়া কার্লোস তাদের সম্পর্কের সূচনা নিয়েও কথা বলেন। তিনি জানান, তিনি সুহাইলার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ করেছিলেন ফুটবল সংক্রান্ত এক ব্যবসায়িক বৈঠকে। তিনি সুহাইলাকে একজন সফল ব্যবসায়ী নারী হিসেবে বর্ণনা করেন এবং জানান যে তারা প্রায় দুই বছর ধরে ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে সম্পর্কিত রয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, রবার্তো কার্লোসের জন্ম ১৯৭৩ সালে ব্রাজিলের গার্সা শহরে। তিনি উনিয়াও সাও জোয়াও ক্লাব থেকে তার ক্যারিয়ার শুরু করেন, এরপর পালমেইরাস হয়ে ইন্টার মিলানে যান, এবং পরবর্তীতে রিয়াল মাদ্রিদে তার ক্যারিয়ারের শীর্ষে পৌঁছান। স্পেনে ১১ মৌসুমে তিনি চারটি লা লিগা শিরোপা ও তিনটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন এবং ৫০০-র বেশি ম্যাচ খেলে ক্লাবের হয়ে অসাধারণ অবদান রাখেন। এছাড়া তিনি তুরস্কের ফেনারবাচে ক্লাবেও দুই মৌসুম খেলেছেন এবং পরবর্তীতে তুরস্কের বিভিন্ন ক্লাবের কোচও ছিলেন, যা তার তুরস্কের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংশ্লিষ্টতা তুলে ধরে এবং এই গুজব ছড়ানোর পেছনে তুর্কি মিডিয়ার আগ্রহেরও একটি কারণ হতে পারে।
সবমিলিয়ে, ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এই ধর্মান্তর-গুজবের অবসান ঘটিয়ে রবার্তো কার্লোস স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তিনি ইসলামকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করলেও নিজের ধর্ম পরিবর্তন করেননি। তার বিয়ের বহুমাত্রিক অনুষ্ঠান আসলে ছিল দুই সংস্কৃতি ও পরিবারের প্রতি সম্মান জানানোর একটি প্রয়াস মাত্র, যা পরবর্তীতে ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে ধর্মান্তরের গুজবে রূপ নেয়। তার এই স্পষ্ট বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সপ্তাহব্যাপী চলা এই বিতর্কের অবসান ঘটেছে।
তথ্যসূত্র : Goal.com
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!