দেশজুড়ে চলমান লোডশেডিংয়ের প্রভাব এবার মোবাইল ইন্টারনেট সেবাতেও পড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি মোবাইল অপারেটর টেলিটকের ইন্টারনেট সেবা বন্ধ বা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা। এতে অনলাইন ক্লাস, ফ্রিল্যান্সিং, অফিসের কাজ, জরুরি যোগাযোগসহ দৈনন্দিন ইন্টারনেটনির্ভর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব গ্রাহক মাসিক মেয়াদের ডাটা প্যাকেজ ব্যবহার করছেন, তাদের অভিযোগ—ইন্টারনেট ব্যবহার করতে না পারলেও প্যাকেজের মেয়াদ ঠিকই কমে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও কয়লার সংকট, বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সমস্যা এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে লোডশেডিং বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্যেও আগস্টের শুরুতে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেছে।
এই পরিস্থিতিতে মোবাইল নেটওয়ার্কের টাওয়ার ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোতে পর্যাপ্ত ব্যাকআপ বিদ্যুৎ না থাকলে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর মোবাইল ডাটা সেবা বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। টেলিটকের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন সমস্যার একটি নির্দিষ্ট চিত্র সামনে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় লোডশেডিং হলেই টেলিটকের সিমে নেটওয়ার্ক দেখা গেলেও ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষার্থী।
রোববার (১৬ আগস্ট) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় টেলিটকের ইন্টারনেট সেবার এমন পরিস্থিতির কথা জানান। তাদের অভিযোগ, মোবাইল ফোনে টেলিটকের নেটওয়ার্ক সিগন্যাল থাকলেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ইন্টারনেট কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ফলে প্রয়োজনের সময় অনলাইনে সংযুক্ত থাকা কঠিন হয়ে যায়। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই সমস্যা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও অনলাইনভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সালাউদ্দিন সাকিব বলেন, তিনি অনলাইনে পড়ান এবং তার টেলিটক সিমে এখনও ৮ গিগাবাইট ডাটা রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে সেই ডাটা থাকা সত্ত্বেও টেলিটকের ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায় না। এতে প্রতিনিয়ত তাকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, বর্তমান সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অনলাইন ক্লাস, ভার্চুয়াল মিটিং, ফ্রিল্যান্সিং, ই-মেইল, ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও মোবাইল ডাটার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে গেলে এর প্রভাব ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীর পাশাপাশি শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও পড়ে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ এবং আইসিটি সেলের অতিরিক্ত পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রোকনুদ্দিন ফারুকী জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে টেলিটকের ইন্টারনেট সিস্টেম পরিচালনা বা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করা হয় না। বিষয়টি টেলিটক চট্টগ্রামের আঞ্চলিক অফিস থেকে সরাসরি পরিচালনা করা হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় টেলিটকের নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবার কারিগরি সমস্যার সমাধানও সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটরের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
এ বিষয়ে টেলিটক চট্টগ্রাম অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জামাল উদ্দিন বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে টেলিটকের যাবতীয় বিষয় তাদের পক্ষ থেকেই দেখাশোনা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে টাওয়ার বাবদ প্রতিবছর নির্ধারিত ফি পরিশোধ করা হয়। তিনি সমস্যাটির কারণ হিসেবে ব্যাটারি ব্যাকআপ না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাটারি ব্যাকআপের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে ইন্টারনেট সেবায় এমন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিষয়টি সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
টেলিটকের নিজস্ব কার্যক্রমেও ব্যাকআপ অবকাঠামো জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। টেলিটকের সাম্প্রতিক টেন্ডার তথ্যের মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলের কুমিল্লা কোর সাইটের জন্য লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সরবরাহের পাশাপাশি কক্সবাজারে পোর্টেবল জেনারেটর সরবরাহের উদ্যোগের তথ্য রয়েছে। একই সঙ্গে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও অপ্টিমাইজেশনের বিভিন্ন কাজও চলমান রয়েছে।
তবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা শুধু একটি নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় দিকটি আড়ালে থেকে যেতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন লোডশেডিং দীর্ঘ হচ্ছে, তখন মোবাইল অপারেটরগুলোর টাওয়ারে পর্যাপ্ত ব্যাকআপ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় যদি মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু থাকলেও ডাটা সেবা কার্যকর না থাকে, তাহলে গ্রাহকের জন্য সেবাটির ব্যবহারিক সুবিধা অনেকটাই কমে যায়।
বিশেষ করে যারা ৩০ দিন বা তার বেশি মেয়াদের ডাটা প্যাকেজ কিনছেন, তাদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ না থাকায় ইন্টারনেট ব্যবহার করা না গেলেও প্যাকেজের মেয়াদ স্বাভাবিক নিয়মেই চলতে থাকে। ফলে দীর্ঘ সময় নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে না পারলে গ্রাহকরা অর্থের বিনিময়ে কেনা ডাটার একটি অংশ ব্যবহার করার সুযোগ হারাতে পারেন। এতে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং টেলিটক কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের পর এখন গ্রাহকদের প্রত্যাশা, লোডশেডিংয়ের সময় যাতে টেলিটকের ইন্টারনেট সেবা সচল থাকে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাকআপ ব্যবস্থা দ্রুত নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে দেশের যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সঙ্গে মোবাইল ডাটা সেবা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, সেসব এলাকায় নেটওয়ার্ক অবকাঠামো পর্যালোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন গ্রাহকেরা।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!