সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন আইনে শুধু চালক বা গাড়ির মালিক নয়, যাত্রী ও পথচারীদের জন্যও শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’-এ সড়কে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে যাত্রী, পথচারী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়া আইনে বলা হয়েছে, চালককে দ্রুত গাড়ি চালাতে উৎসাহ দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়িতে ওঠা, জানালা দিয়ে হাত বা মাথা বের করা এবং নির্ধারিত আসনের বাইরে বসার মতো কর্মকাণ্ড করলে যাত্রীকে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা জরিমানা করা হতে পারে।

একইভাবে ফুটপাত ব্যবহার না করে সড়কে চলাচল করলে পথচারীকেও সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা জরিমানার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। পথচারীদের জন্য ফুটপাত, নির্ধারিত পারাপার স্থান ও নিরাপদ সড়কদ্বীপ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।

তবে দেশে অনেক জায়গায় ফুটপাত দখল, অনুপস্থিতি বা চলাচলের অনুপযোগী থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। খসড়া আইনে নিরাপদ ফুটপাত, পর্যাপ্ত পারাপার ব্যবস্থা ও সড়কদ্বীপ তৈরির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে মোটরসাইকেলে ছয় বছরের কম বয়সী শিশুকে সহযাত্রী হিসেবে নেওয়া নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়স্ককে লাইসেন্স ছাড়া মোটরসাইকেল চালানোর সুযোগ দিলে মালিক বা অভিভাবককেও দায়ী করার বিধান রাখা হচ্ছে।

এ ছাড়া চালক ও সহযাত্রীর জন্য মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ১৩৫ সেন্টিমিটারের কম উচ্চতার বা ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুকে গাড়ির সামনের আসনে বসানো যাবে না। শিশুদের জন্য বয়স, উচ্চতা ও ওজন অনুযায়ী বিশেষ নিরাপত্তা আসন ব্যবহারের প্রস্তাবও রয়েছে।

নতুন আইনে গতি নিয়ন্ত্রণেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে মোটরযানের সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার এবং শহর এলাকায় ৪০ কিলোমিটার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ জন্য স্পিড ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় স্পিড ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হয়েছে।

পথচারী পারাপারের স্থান, মোড় ও রেলক্রসিংয়ের ৫০ মিটারের মধ্যে ওভারটেকিং নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি কুয়াশা, বৃষ্টি বা ধুলার কারণে দৃষ্টিসীমা কমে গেলে এবং জনবহুল এলাকাতেও ওভারটেকিং করা যাবে না।

ক্লান্ত বা ঝিমুনি অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং প্রয়োজন ছাড়া এক হাতে স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করাও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এসব অপরাধে প্রথমবার সর্বোচ্চ এক মাস কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি চালকের এক পয়েন্ট কাটার বিধানও রাখা হয়েছে।

মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো শনাক্তে চালকের নিঃশ্বাস, রক্ত বা অন্যান্য নমুনা পরীক্ষার সুযোগ রাখা হয়েছে। নমুনা দিতে অস্বীকার করলে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।

নিরাপদ যানবাহন নিশ্চিত করতে এয়ারব্যাগ, সিটবেল্ট, স্পিড গভর্নর, অ্যান্টিলক ব্রেকিং সিস্টেম, জিপিএস ট্র্যাকার, ড্যাশ ক্যামেরা ও ড্রাইভিং মনিটরিং সিস্টেম ব্যবহারের বিষয়েও খসড়ায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া যানবাহনের ফিটনেস, চালকের যোগ্যতা, অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল পরিবহন, চালক-কর্মীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা এবং নিয়োগপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবহন মালিকদের দায়িত্ব নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

সড়কের নকশা, নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় নিয়ম লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেও দায়ী করার বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা ন্যূনতম এক লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’ বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে রয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর এটি আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হবে। যাচাই-বাছাই শেষে সংসদে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন করলেই সড়ক নিরাপদ হবে না। কার্যকর প্রয়োগ, নিরাপদ ফুটপাত, আধুনিক যানবাহন, প্রযুক্তির ব্যবহার ও সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে তবেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!