রাঙামাটি শহরের পর্যটনকেন্দ্র ঝুলন্ত ব্রিজ এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে দেশি-বিদেশি মদ পাওয়ার বিজ্ঞাপন ও মোবাইল নম্বরসংবলিত সাইনবোর্ড টাঙানোর ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যস্ত জনসমাগমস্থলে এমন বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন—লাইসেন্সধারী বার পরিচালনার অনুমতি থাকলেও জনসম্মুখে মদের বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের অনুমতি কে দিয়েছে? আর অনুমোদন ছাড়া হলে এর দায়ভারই বা কার?
জানা গেছে, রাঙামাটি শহরে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অধীন পর্যটন বারের লিজ নেওয়া প্রতিষ্ঠান এইচ এম এন্টারপ্রাইজ ঝুলন্ত ব্রিজ এলাকায় এসব সাইনবোর্ড টাঙায়। সাইনবোর্ডে দেশি-বিদেশি মদ পাওয়ার তথ্যের পাশাপাশি যোগাযোগের জন্য একটি মোবাইল নম্বর উল্লেখ করা হয়। দিনের বেলায় পর্যটন এলাকার ব্যস্ত সড়কে সাইনবোর্ডগুলো দৃশ্যমান হওয়ায় দ্রুত তা স্থানীয়দের নজরে আসে। পরে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, পর্যটন শহরের জনসম্মুখে মদ বিক্রির এমন প্রচারণা কিশোর ও তরুণদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের পর্যটক, পরিবার ও শিক্ষার্থীদের চলাচল থাকা এলাকায় এ ধরনের বিজ্ঞাপন পর্যটন এলাকার পরিবেশ ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মন্তব্য করেন অনেকে।
বিষয়টি পুলিশের নজরে আসার পর রাঙামাটি কোতোয়ালি থানার পক্ষ থেকে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়। পরে পর্যটন করপোরেশনের ম্যানেজার আলোক বিকাশ চাকমার উদ্যোগে লোকজন দিয়ে সাইনবোর্ডগুলো খুলে ফেলা হয়।
এইচ এম এন্টারপ্রাইজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যানেজার পাপন বণিক বলেন, পর্যটন করপোরেশন থেকে তারা বারটি লিজ নিয়েছেন। তবে আশানুরূপ বিক্রি না হওয়ায় গ্রাহকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সাইনবোর্ডগুলো টাঙানো হয়েছিল।
তিনি দাবি করেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়েই সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। তবে পর্যটন করপোরেশনের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি বলেও তিনি স্বীকার করেন
পাপন বণিক বলেন, “আমরা সরকারকে ট্যাক্স দিই এবং বাংলাদেশে উৎপাদিত সার্টিফায়েড কেরু মদ লাইসেন্সের আওতায় বিক্রি করি। পর্যটন এলাকায় আমাদের একটি বার রয়েছে। এ বিষয়টি পর্যটকদের জানাতেই সাইনবোর্ড দেওয়া হয়েছিল।”
তবে এই দাবির সঙ্গে সরাসরি দ্বিমত পোষণ করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
রাঙামাটির মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নাহিদ হাসান সৌরভ বলেন, “আমরা এ ধরনের কোনো অনুমতি দিইনি। এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনাও হয়নি। যারা এটি করেছে, তারা অপরাধ করেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশনের ম্যানেজার আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, পর্যটন করপোরেশনের পক্ষ থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কখনো করা হয়নি। লিজ নেওয়া প্রতিষ্ঠানটি নিয়মবহির্ভূতভাবে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে রাঙামাটি পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব-পিপিএম বলেন, “এ ধরনের সাইনবোর্ড ঝোলানো পুরোপুরি আইনবহির্ভূত। এতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি মোটেও ভালো কিছু নয়।”
ঘটনার পর এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে অনুমতির বিষয়টি নিয়ে। একটি লাইসেন্সধারী বার পরিচালনার অনুমতি থাকলেই কি জনসম্মুখে মদ বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের অনুমতি পাওয়া যায়—এ প্রশ্নও উঠেছে। বিশেষ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যেখানে এমন কোনো অনুমতি দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে, সেখানে প্রতিষ্ঠানটি কোন অনুমতির ভিত্তিতে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছিল, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
সচেতন মহলের মতে, শুধু সাইনবোর্ড খুলে ফেললেই বিষয়টির সমাধান হবে না। কার অনুমতিতে, কোন বিধির আওতায় এবং কী উদ্দেশ্যে এসব সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছিল—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো আইন বা বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
রাঙামাটির মতো পর্যটননির্ভর শহরের সৌন্দর্য, পারিবারিক পরিবেশ ও পর্যটনবান্ধব ভাবমূর্তি রক্ষায় জনসম্মুখে মদ বিক্রির প্রচারণার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিকরা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পর্যটন এলাকা ও জনসম্মুখে এ ধরনের বিজ্ঞাপন যাতে প্রদর্শিত না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি ও সমন্বিত পদক্ষেপেরও দাবি জানান তারা।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!