জীবনের নানা পরিস্থিতিতে মানুষ দুশ্চিন্তায় পড়ে। সংসারের সমস্যা, অর্থনৈতিক সংকট, ঋণ, চাকরি বা ব্যবসার অনিশ্চয়তা, পারিবারিক টানাপোড়েন কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে কখনো কখনো মন ভারী হয়ে যায়। এমন সময় একজন মুমিনের প্রথম আশ্রয় হওয়া উচিত আল্লাহ তাআলা। ইসলাম দুশ্চিন্তাকে অস্বীকার করে না; বরং দুশ্চিন্তা ও দুঃখের সময় আল্লাহকে স্মরণ করা, তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং ধৈর্য ধারণ করার শিক্ষা দেয়। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (সুরা রাদ: ২৮)।

দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া করতেন। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলতেন—

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ

বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল-হাম্মি ওয়াল-হাযানি, ওয়াল-আজযি ওয়াল-কাসালি, ওয়াল-জুবনি ওয়াল-বুখলি, ওয়া দালাইদ-দাইনি, ওয়া গালাবাতির-রিজাল।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কাপুরুষতা ও কৃপণতা থেকে, ঋণের বোঝা এবং মানুষের কাছে পরাভূত হওয়া থেকে। এই দোয়াটি সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে।

এই দোয়াটির বিশেষত্ব হলো, এতে শুধু দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়নি; বরং মানুষের জীবনে দুশ্চিন্তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরও কয়েকটি বিষয় থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। অক্ষমতা ও অলসতা মানুষকে নিজের দায়িত্ব পালনে পিছিয়ে দিতে পারে, কৃপণতা মানুষকে কল্যাণের কাজ থেকে দূরে রাখতে পারে, ঋণের বোঝা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে এবং মানুষের কাছে অসহায় হয়ে পড়াও জীবনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাই এসব বিষয়কে একসঙ্গে নিয়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন।

এখানে “হাম্ম” ও “হাযান” শব্দ দুটির অর্থও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে “হাম্ম” বলতে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা এবং “হাযান” বলতে অতীতের কোনো ঘটনা বা ক্ষতি থেকে সৃষ্ট দুঃখ বোঝানো হয়। অর্থাৎ এই দোয়াটি মানুষের মনের দুই ধরনের ভারের কথাই সামনে আনে—আগামীকাল কী হবে তা নিয়ে উদ্বেগ এবং অতীতে ঘটে যাওয়া বিষয় নিয়ে দুঃখ। একজন মানুষ যখন এই দুই ধরনের চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ে, তখন সে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে পারে।

তবে এই দোয়া পড়লে দুশ্চিন্তা সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ দূর হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া ঠিক নয়। ইসলামে কোনো দোয়াকে এমন যান্ত্রিক সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। বরং এই দোয়া হলো আল্লাহর কাছে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে তাঁর সাহায্য চাওয়ার একটি সুন্নত পদ্ধতি। দোয়ার পাশাপাশি যে সমস্যার কারণে দুশ্চিন্তা হচ্ছে, তার বৈধ সমাধানের জন্য চেষ্টা করাও জরুরি। ঋণ থাকলে তা পরিশোধের পরিকল্পনা করতে হবে, পারিবারিক সমস্যা থাকলে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে, আর্থিক সমস্যা হলে হালাল উপার্জনের পথ খুঁজতে হবে এবং প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ নিতে হবে।

কোরআনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, বিপদের সময় ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর।” (সুরা বাকারা: ১৫৩)। তাই দুশ্চিন্তার সময় শুধু নিজের চিন্তার মধ্যে ডুবে না থেকে নামাজ আদায় করা, আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে দোয়া করা এবং তাঁর ওপর ভরসা করা একজন মুমিনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আমল।

দুশ্চিন্তার সময় আল্লাহর জিকিরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (সুরা রাদ: ২৮)। এর অর্থ এই নয় যে আল্লাহকে স্মরণ করলেই জীবনের সব সমস্যা শেষ হয়ে যাবে। বরং আল্লাহর স্মরণ মানুষের অন্তরকে এমন শক্তি ও প্রশান্তি দিতে পারে, যার মাধ্যমে সে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও ধৈর্য ও ভরসা ধরে রাখতে পারে।

দুশ্চিন্তার সময় কেউ চাইলে হজরত ইউনুস (আ.)-এর দোয়াও পড়তে পারেন। কোরআনে তাঁর দোয়া এসেছে—

لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ

বাংলা উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমিন।

অর্থ: আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; আপনি পবিত্র ও মহিমান্বিত। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। (সুরা আম্বিয়া: ৮৭)

হজরত ইউনুস (আ.) কঠিন পরিস্থিতিতে এই দোয়া করেছিলেন। এরপর আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করে তাঁকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন। এই ঘটনা মুমিনের জন্য বড় শিক্ষা—বিপদ যত কঠিনই হোক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না।

দুশ্চিন্তা কমানোর জন্য দৈনন্দিন জীবনে কিছু সুন্নত অভ্যাসও গড়ে তোলা যেতে পারে। নিয়মিত নামাজ আদায় করা, কোরআন তিলাওয়াত করা, সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির করা, বেশি বেশি ইস্তিগফার করা এবং নিজের সমস্যা আল্লাহর কাছে তুলে ধরা অন্তরকে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত রাখে। পাশাপাশি নিজের ঘুম, খাবার, কাজের চাপ ও পারিবারিক সম্পর্কের দিকেও খেয়াল রাখা দরকার। কারণ মানুষের মানসিক চাপ অনেক সময় বাস্তব জীবনের সমস্যার সঙ্গেও জড়িত থাকে।

একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র দুশ্চিন্তা যদি দৈনন্দিন জীবন, ঘুম, কাজ বা স্বাভাবিক জীবনযাপনকে গুরুতরভাবে ব্যাহত করে, তাহলে শুধু দোয়ার ওপর নির্ভর না করে বিশ্বস্ত চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াও ইসলামবিরোধী নয়। চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি দোয়া ও ইবাদত করা যেতে পারে। আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ সমস্যার বাস্তব সমাধানের চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়।

তাই দুশ্চিন্তার মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াটি নিয়মিত পড়া যেতে পারে। নিজের ভাষায়ও আল্লাহর কাছে মনের কথা বলা যায়। কারণ আল্লাহ বান্দার অবস্থা জানেন এবং তাঁর কাছে কোনো কথা গোপন নয়। একজন মুমিন যখন নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায়, তখন সে অন্তত এটুকু অনুভব করতে পারে যে তার সমস্যা মোকাবিলায় সে একা নয়।

সবশেষে বলা যায়, দুশ্চিন্তা মানুষের জীবনের বাস্তব পরীক্ষা হতে পারে। কিন্তু সেই দুশ্চিন্তার মধ্যেও একজন মুসলমানের জন্য আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছেন। তাই দুশ্চিন্তার সময় হতাশ না হয়ে এই দোয়া পড়ুন, নামাজ ও জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করুন, সমস্যার বৈধ সমাধানে চেষ্টা করুন এবং আল্লাহর রহমতের ওপর আশা রাখুন।

দুশ্চিন্তা ও দুঃখের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াটি পড়ুন এবং মনে রাখুন—আল্লাহর স্মরণ মুমিনের অন্তরের জন্য প্রশান্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে দোয়ার পাশাপাশি জীবনের সমস্যার বাস্তব ও বৈধ সমাধানের চেষ্টাও চালিয়ে যেতে হবে।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!