দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার ঘটনা এখন অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে ঘরের আলো, ফ্যান, ইন্টারনেট কিংবা অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে ফ্রিজে সংরক্ষিত খাবার। বিশেষ করে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, রান্না করা খাবার ও অন্যান্য পচনশীল খাবার দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে নিরাপদ থাকবে কি না—এ নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন থাকে।
বিশেষজ্ঞদের খাদ্য নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ফ্রিজের দরজা বন্ধ রাখা গেলে সাধারণ একটি ফ্রিজের ভেতরের খাবার প্রায় ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত নিরাপদ তাপমাত্রায় থাকতে পারে। তবে এই সময়ের পর খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রথম কাজ ফ্রিজের দরজা বন্ধ রাখা
লোডশেডিং শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই ফ্রিজ খুলে দেখে নিতে চান ভেতরের খাবার ঠিক আছে কি না। কিন্তু বারবার দরজা খোলা খাবার দ্রুত গরম হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে।
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ফ্রিজের দরজা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখতে হবে। দরজা বন্ধ থাকলে ভেতরের ঠান্ডা বাতাস দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকে। FoodSafety.gov-এর তথ্য অনুযায়ী, দরজা না খুললে একটি ফ্রিজ সাধারণত প্রায় ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত খাবার নিরাপদ রাখার মতো ঠান্ডা থাকতে পারে।
তাই শুধু ফ্রিজের ভেতরে খাবার আছে কি না দেখার জন্য বারবার দরজা খোলা উচিত নয়।
৪ ঘণ্টার পর কোন খাবার নিয়ে সতর্ক হবেন?
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সময়সীমা ৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলে ফ্রিজে থাকা দ্রুত নষ্ট হওয়ার খাবার নিয়ে সতর্ক হতে হবে। বিশেষ করে কাঁচা বা রান্না করা মাংস, মাছ, মুরগি, ডিম, দুধ, রান্না করা খাবার, স্যুপ, ঝোল ও বিভিন্ন ধরনের প্রস্তুত খাবার ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
FoodSafety.gov-এর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এসব পচনশীল খাবার যদি ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় ২ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় থাকে, তাহলে তা ফেলে দেওয়া উচিত। আর পরিবেশের তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে এই সময়সীমা আরও কমে ১ ঘণ্টা হতে পারে।
বাংলাদেশের গরম আবহাওয়ার কথা বিবেচনা করলে দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের সময় এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রিজের খাবার নিরাপদ কি না বুঝবেন কীভাবে?
অনেকেই খাবারের গন্ধ বা চেহারা দেখে সিদ্ধান্ত নেন খাবারটি ভালো আছে কি না। কিন্তু এটি সবসময় নিরাপদ পদ্ধতি নয়।
ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া খাবারে বেড়ে গেলেও খাবারের গন্ধ, রং বা স্বাদে সবসময় পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তাই শুধু খাবারে দুর্গন্ধ নেই বা দেখতে স্বাভাবিক—এমন কারণে সেটিকে নিরাপদ ধরে নেওয়া উচিত নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সন্দেহ হলে খাবার মুখে দিয়ে পরীক্ষা করা যাবে না। FoodSafety.gov সরাসরি খাবারের নিরাপত্তা যাচাই করতে স্বাদ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছে।
ফ্রিজার হলে সময় কত বেশি?
ফ্রিজের সাধারণ অংশের তুলনায় ফ্রিজারের খাবার অনেক বেশি সময় ঠান্ডা থাকতে পারে। দরজা বন্ধ রাখা হলে একটি পুরো ভর্তি ফ্রিজার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত এবং অর্ধেক ভর্তি ফ্রিজার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত নিরাপদ তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ৪৮ ঘণ্টা পর সব খাবার অবশ্যই নষ্ট হয়ে যাবে। বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর ফ্রিজারের খাবার পরীক্ষা করতে হবে। কোনো খাবারে বরফের কণা এখনও থাকলে এবং খাবারটি ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে থাকলে তা পুনরায় জমিয়ে রাখা বা রান্না করা নিরাপদ হতে পারে।
দীর্ঘ লোডশেডিং হলে কী করবেন?
যদি আগে থেকেই বোঝা যায় যে কয়েক ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকবে না, তাহলে খাবার নিরাপদ রাখতে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, ফ্রিজ ও ফ্রিজারের দরজা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, বরফ বা আইস প্যাক থাকলে তা ব্যবহার করে খাবার ঠান্ডা রাখা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে পচনশীল খাবারগুলো একটি ইনসুলেটেড কুলারে রেখে পর্যাপ্ত বরফ ব্যবহার করা যেতে পারে।
এক্ষেত্রে খাবারের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যুৎ ফিরে আসার পরই কি সব খাবার খাওয়া যাবে?
না। বিদ্যুৎ ফিরে আসার পর ফ্রিজ চালু হলেই সব খাবার নিরাপদ হয়ে যায়—এমন ধারণা ঠিক নয়।
প্রথমে কতক্ষণ বিদ্যুৎ ছিল না তা হিসাব করতে হবে। এরপর ফ্রিজের ভেতরের পচনশীল খাবারের অবস্থা বিবেচনা করতে হবে। খাবার দীর্ঘ সময় নিরাপদ তাপমাত্রার বাইরে থাকলে শুধু আবার ফ্রিজে রেখে দিলেই তা নিরাপদ হয়ে যায় না।
বিশেষ করে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, রান্না করা খাবার ও অন্যান্য পচনশীল খাবারের ক্ষেত্রে সন্দেহ থাকলে ফেলে দেওয়াই নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
ঘরে একটি ফুড থার্মোমিটার রাখা কেন জরুরি?
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ফ্রিজের ভেতরের প্রকৃত তাপমাত্রা জানা থাকলে খাবার নিরাপদ কি না সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হয়। FoodSafety.gov ফ্রিজে একটি অ্যাপ্লায়েন্স থার্মোমিটার রাখার পরামর্শ দেয়। ফ্রিজের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে এবং ফ্রিজারের তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখা উচিত।
লোডশেডিংপ্রবণ এলাকায় নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে এটি পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি কার্যকর প্রস্তুতি হতে পারে।
মনে রাখবেন এই সহজ নিয়ম
বিদ্যুৎ চলে গেলে ফ্রিজের দরজা বন্ধ রাখুন। সাধারণ ফ্রিজে খাবার প্রায় ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত নিরাপদ থাকতে পারে। ফ্রিজার পূর্ণ থাকলে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা, আর অর্ধেক ভর্তি থাকলে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ঠান্ডা ধরে রাখতে পারে—তবে দরজা বন্ধ রাখা জরুরি।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খাবার নিরাপদ কি না বুঝতে কখনো স্বাদ নিয়ে পরীক্ষা করবেন না। সন্দেহ থাকলে ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।
বর্তমান লোডশেডিং পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ চলে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে পরিকল্পিতভাবে ফ্রিজ ব্যবহার করলে খাবার নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার আশঙ্কা থাকলে আগে থেকেই বরফ, আইস প্যাক, কুলার ও প্রয়োজনীয় খাদ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে রাখা যেতে পারে।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!