মানুষের জীবনে অর্থের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। খাবার, পোশাক, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা পরিবারের প্রয়োজন—প্রায় সব ক্ষেত্রেই অর্থের প্রয়োজন হয়। তবে শুধু বেশি টাকা থাকলেই যে জীবনে স্বস্তি ও সুখ থাকবে, এমন নয়। অনেকের আয় তুলনামূলক ভালো হলেও মাস শেষ হওয়ার আগেই টাকা শেষ হয়ে যায়। আবার কারও আয় সীমিত হলেও সংসারে অভাবের অনুভূতি তুলনামূলক কম থাকে। ইসলামের দৃষ্টিতে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বরকত। অর্থাৎ সম্পদে এমন কল্যাণ থাকা, যার ফলে তা প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট হয় এবং আল্লাহর আনুগত্যের কাজে ব্যবহৃত হয়।
টাকার বরকত কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে সমাজে নানা ধরনের কথা প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু ইসলামি বিষয়ে অনুমান বা লোকমুখে প্রচলিত কথা নয়, কোরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের নির্দেশনাকেই ভিত্তি করা জরুরি। ইসলামের আলোকে সম্পদে বরকতের সঙ্গে হালাল উপার্জন, তাকওয়া, কৃতজ্ঞতা, দান-সদকা এবং আল্লাহর ওপর ভরসার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একইভাবে হারাম উপার্জন, প্রতারণা, অন্যের হক নষ্ট করা এবং অকৃতজ্ঞতা মানুষের সম্পদে বরকত কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে।
টাকার বরকত কমে যাওয়ার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো হারাম উপার্জন। ইসলামে শুধু কত টাকা উপার্জন করা হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কীভাবে সেই টাকা উপার্জন করা হচ্ছে সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘুষ, সুদ, প্রতারণা, চুরি, জালিয়াতি, ওজনে কম দেওয়া কিংবা মানুষের অধিকার নষ্ট করে উপার্জিত অর্থ বাহ্যিকভাবে সম্পদ বাড়ালেও তাতে বরকত থাকে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন। (সহিহ মুসলিম)। তাই উপার্জনের পরিমাণ কম হলেও তা যদি হালাল হয়, তাহলে সেই অর্থে বরকতের আশা করা যায়।
দ্বিতীয় কারণ হলো সুদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। কোরআনে আল্লাহ তাআলা সুদ সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন।” (সুরা বাকারা: ২৭৬)। এখানে বৃদ্ধি বলতে শুধু দৃশ্যমান টাকার পরিমাণ বোঝানো হয় না; বরং বরকতের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মানুষ মনে করে সুদের মাধ্যমে সম্পদ দ্রুত বাড়ানো সম্ভব, কিন্তু ইসলামি দৃষ্টিতে সুদ মানুষের সম্পদে কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল পথ বেছে নেওয়া একজন মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।
তৃতীয় কারণ হলো আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়া। মানুষ যখন তার হাতে থাকা অর্থ, খাবার, পরিবার, সুস্থতা ও অন্যান্য নিয়ামতকে স্বাভাবিক বিষয় মনে করে এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে না, তখন তার জীবনে বরকতের অনুভূতি কমে যেতে পারে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তোমরা যদি কৃতজ্ঞ হও, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।” (সুরা ইবরাহিম: ৭)। তাই অল্প সম্পদ হলেও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা গুরুত্বপূর্ণ। শুকরিয়া শুধু মুখে “আলহামদুলিল্লাহ” বলা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া সম্পদ সঠিক ও বৈধ কাজে ব্যবহার করাও শুকরিয়ার অংশ।
চতুর্থ কারণ হলো অন্যের হক নষ্ট করা। কারও পাওনা আটকে রাখা, কর্মচারীর প্রাপ্য বেতন দিতে দেরি করা, ব্যবসায় প্রতারণা করা, অংশীদারের অধিকার আত্মসাৎ করা কিংবা ধার নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিশোধ না করা—এসব মানুষের সম্পদের সঙ্গে অন্য মানুষের অধিকারকে জড়িয়ে দেয়। ইসলাম মানুষের হককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করলে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়; যার অধিকার নষ্ট করা হয়েছে, তার হক ফিরিয়ে দেওয়াও জরুরি। তাই অর্থের বরকত চাইলে উপার্জনের পাশাপাশি লেনদেনেও সততা বজায় রাখা দরকার।
পঞ্চম কারণ হলো দান-সদকা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা এবং সম্পদকে কেবল নিজের জন্য জমিয়ে রাখা। আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেছেন, “তোমরা যা কিছু ভালো কাজে ব্যয় করো, আল্লাহ তা জানেন।” (সুরা বাকারা: ২৭৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সদকা সম্পদ কমায় না।” (সহিহ মুসলিম)। বাহ্যিকভাবে সদকা করলে হাতে থাকা টাকা কিছুটা কমে যেতে পারে, কিন্তু ইসলামি দৃষ্টিতে সদকা সম্পদে বরকত আনার মাধ্যম। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্র, অসহায় ও প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
অর্থের বরকতের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করারও সম্পর্ক রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার রিজিক প্রশস্ত হওয়া এবং আয়ু বৃদ্ধি পেতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)। এর অর্থ এই নয় যে শুধু আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করলেই নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বেড়ে যাবে; বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকত লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। তাই অর্থ উপার্জনের ব্যস্ততার মাঝেও বাবা-মা, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনের অধিকার ভুলে যাওয়া উচিত নয়।
একইভাবে ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাও রিজিক ও বরকতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। হজরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, তারা যেন তাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। এরপর তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে বৃষ্টি, সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন। (সুরা নূহ: ১০-১২)। তাই নিয়মিত তাওবা ও ইস্তিগফার একজন মুসলমানের জীবনে আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের মাধ্যম হতে পারে।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা দরকার—টাকা বেশি থাকা মানেই বরকত বেশি থাকা নয়। কখনো অল্প অর্থও মানুষের বহু প্রয়োজন পূরণ করে, পরিবারে শান্তি থাকে এবং মানুষ আল্লাহর আনুগত্যে তা ব্যয় করতে পারে। আবার বিপুল অর্থ থাকা সত্ত্বেও একজন মানুষ অশান্তি, ঋণ, অসুস্থতা কিংবা নানা সমস্যায় জর্জরিত থাকতে পারেন। তাই একজন মুসলমানের লক্ষ্য শুধু সম্পদের পরিমাণ বাড়ানো নয়; বরং হালাল উপার্জন, সম্পদে বরকত এবং সেই সম্পদকে সঠিক কাজে ব্যবহার করা।
রিজিক ও বরকতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোরআনে হজরত মুসা (আ.)-এর একটি দোয়া এসেছে—
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
উচ্চারণ: রব্বি ইন্নি লিমা আনজালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাকির।
অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করবেন, আমি অবশ্যই তার মুখাপেক্ষী। (সুরা কাসাস: ২৪)
এই দোয়াটি পড়ে একজন মুসলমান আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন ও মুখাপেক্ষিতার কথা প্রকাশ করতে পারেন। তবে শুধু দোয়া করলেই হবে না; এর পাশাপাশি হালাল পথে চেষ্টা করা, পরিশ্রম করা এবং অন্যায় উপার্জন থেকে দূরে থাকা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, টাকার বরকত কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু কত টাকা খরচ হলো তার হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। অর্থ কোথা থেকে আসছে, কোথায় ব্যয় হচ্ছে, কার অধিকার এতে জড়িত, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা কতটা এবং অসহায় মানুষের জন্য সেই সম্পদ থেকে কতটা ব্যয় করা হচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি বরকতের জন্যও দোয়া করা উচিত।
আজকের শিক্ষা: হালাল উপার্জন করুন, সুদ ও প্রতারণা থেকে বাঁচুন, মানুষের হক আদায় করুন, আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করুন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করুন। কারণ জীবনে প্রকৃত সফলতা শুধু বেশি টাকা থাকা নয়; বরং অল্প সম্পদেও আল্লাহর বরকত থাকা।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!