দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি ও দীর্ঘ সময় লোডশেডিং নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিং বেড়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কোথাও কোথাও দিনের পাশাপাশি রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

লোডশেডিং এখন অনেক পরিবারের জন্য শুধু সাময়িক অসুবিধা নয়। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফ্রিজ, বৈদ্যুতিক পাখা, পানির পাম্প থেকে শুরু করে অনলাইন অফিস ও পড়াশোনা—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ছে। তাই হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে আতঙ্কিত না হয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ দ্রুত করা দরকার।

১. গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ বা নিরাপদ অবস্থায় রাখুন

বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টেলিভিশন, কম্পিউটার, রাউটার, মাইক্রোওয়েভ, চার্জারসহ অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রের সুইচ বন্ধ করে দেওয়া ভালো। বিশেষ করে যেসব যন্ত্র বিদ্যুৎ আসার সময় ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি।

লোডশেডিং শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একসঙ্গে সব বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালু না করে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী একে একে চালু করা নিরাপদ পদ্ধতি। সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ক্ষেত্রে সার্জ প্রটেক্টর বা উপযুক্ত ভোল্টেজ সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করাও বিবেচনা করা যেতে পারে।

২. ফ্রিজের দরজা অযথা খুলবেন না

লোডশেডিংয়ের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো ফ্রিজের দরজা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখা। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর বারবার দরজা খুললে ভেতরের ঠান্ডা দ্রুত বের হয়ে যায় এবং খাবার নিরাপদ রাখার সময় কমে যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের FoodSafety.gov-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ না থাকলেও একটি বন্ধ ফ্রিজ সাধারণত প্রায় ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখতে পারে। তবে দরজা যত কম খোলা হবে, খাবার ঠান্ডা থাকার সম্ভাবনা তত বেশি। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে মাংস, মাছ, ডিম, দুধ ও রান্না করা খাবারের মতো দ্রুত নষ্ট হওয়ার পণ্যের নিরাপত্তা বিশেষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

তাই শুধু ‘বিদ্যুৎ এসেছে কি না’ দেখার জন্য বারবার ফ্রিজ খুলে দেখা ঠিক নয়।

৩. মোবাইল ও জরুরি যোগাযোগের প্রস্তুতি নিন

লোডশেডিং দীর্ঘ হলে মোবাইল ফোনই অনেক সময় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। তাই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর অপ্রয়োজনীয়ভাবে মোবাইল ব্যবহার না করে ব্যাটারি সাশ্রয়ী মোড চালু করা যেতে পারে।

অপ্রয়োজনীয় মোবাইল ডাটা, Bluetooth, GPS, বেশি উজ্জ্বল স্ক্রিন এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে চলা অ্যাপ বন্ধ রাখলে ব্যাটারি কিছুটা বেশি সময় ব্যবহার করা সম্ভব। কাছে পাওয়ার ব্যাংক থাকলে সেটিও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা উচিত।

বিশেষ করে পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি কিংবা বাইরে থাকা সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন হলে মোবাইলের চার্জ অযথা শেষ না করাই ভালো।

৪. ঘরে আলো ও বাতাসের নিরাপদ ব্যবস্থা করুন

লোডশেডিং দিনের বেলায় হলে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করুন। রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে টর্চ, রিচার্জেবল লাইট বা চার্জ করা জরুরি আলো ব্যবহার করা ভালো।

তবে আলো বা আগুনের বিকল্প হিসেবে মোমবাতি ব্যবহার করলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। মোমবাতি পর্দা, কাগজ, কাপড় বা অন্যান্য দাহ্য বস্তুর কাছাকাছি রাখা যাবে না এবং শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে।

গরমের সময় দীর্ঘ লোডশেডিং হলে ঘরের জানালা-দরজা এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যাতে সম্ভব হলে বাতাস চলাচল করতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরমে শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় নিরাপদে ঠান্ডা থাকা ও পর্যাপ্ত পানি পান করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

৫. বিদ্যুৎ আসার পর তাড়াহুড়া করে সবকিছু চালু করবেন না

অনেকেই বিদ্যুৎ আসার সঙ্গে সঙ্গে ফ্যান, টিভি, ফ্রিজ, পানির পাম্প, ACসহ সব বৈদ্যুতিক যন্ত্র একসঙ্গে চালু করেন। এটি না করে প্রথমে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল হয়েছে কি না খেয়াল করা ভালো।

বিশেষ করে এলাকায় যদি বিদ্যুৎ বারবার আসা-যাওয়া করে বা ভোল্টেজ ওঠানামার লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে সংবেদনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্র চালু করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন। প্রয়োজনে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রগুলো পর্যায়ক্রমে চালু করুন।

লোডশেডিংয়ের সময় আরও কয়েকটি বিষয় মনে রাখুন

হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে শুধু বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নয়, পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। লিফট ব্যবহার না করা, বৈদ্যুতিক তার বা খোলা সংযোগে হাত না দেওয়া এবং ভেজা হাতে কোনো বৈদ্যুতিক সুইচ স্পর্শ না করা জরুরি।

জেনারেটর ব্যবহার করলে সেটি কখনোই ঘরের ভেতরে বা বন্ধ জায়গায় চালানো উচিত নয়। জেনারেটরের ধোঁয়া ও কার্বন মনোক্সাইড মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই জেনারেটর ব্যবহারে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা এবং নিরাপত্তা বিধি মেনে চলতে হবে।

লোডশেডিং কখন শেষ হবে তা সবসময় আগে থেকে জানা সম্ভব না হলেও কিছু প্রস্তুতি নিয়ে এর ভোগান্তি অনেকটাই কমানো যায়। বিদ্যুৎ চলে গেলে প্রথমেই বৈদ্যুতিক যন্ত্র নিরাপদ করা, ফ্রিজের দরজা বন্ধ রাখা, মোবাইলের চার্জ সংরক্ষণ, নিরাপদ আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করা এবং বিদ্যুৎ ফিরে এলে ধীরে ধীরে যন্ত্র চালু করা—এই পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দীর্ঘ লোডশেডিং নিয়ে মানুষের উদ্বেগ স্বাভাবিক। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র, উপকেন্দ্র বা বিদ্যুৎ বিভাগের স্থাপনায় হামলা বা ভাঙচুর কোনোভাবেই সমাধান নয়। সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথাও উঠে এসেছে।

তাই সংকটের সময়ে সচেতন থাকা, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই সবচেয়ে জরুরি।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব