ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর একজন মানুষ সাধারণত দিনের কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল আল্লাহর স্মরণ ও সুন্নতের অনুসরণে পরিপূর্ণ। তাই তাঁর ঘুম থেকে ওঠার পরের কিছু আমলও মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুম থেকে জেগে প্রথমেই আল্লাহর প্রশংসা করতেন এবং ঘুমের পর নতুন জীবন দেওয়ার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। হজরত হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ঘুম থেকে জেগে বলতেন, “আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বা‘দা মা আমাতানা, ওয়া ইলাইহিন নুশুর।”

এই দোয়ার আরবি হলো: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ। বাংলা উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বা‘দা মা আমাতানা, ওয়া ইলাইহিন নুশুর। অর্থ: সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের মৃত্যুর মতো ঘুমের পর জীবিত করেছেন এবং তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। সহিহ বুখারির বর্ণনায় এই দোয়াটিই ঘুম থেকে ওঠার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুখে উচ্চারিত হওয়ার কথা এসেছে।

দোয়াটির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এতে একজন মানুষের পুরো জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরা হয়েছে। ঘুমের সময় মানুষ নিজের শরীর ও চারপাশ সম্পর্কে অনেকটাই অসচেতন থাকে। এরপর আল্লাহ তাকে আবার জাগিয়ে তোলেন। তাই ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথমেই আল্লাহর প্রশংসা করা একজন মুমিনের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। এই দোয়ার শেষ অংশে বলা হয়েছে, “ওয়া ইলাইহিন নুশুর”—অর্থাৎ আল্লাহর কাছেই প্রত্যাবর্তন। এতে মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, দুনিয়ার জীবন সাময়িক এবং শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক মানুষকে আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘুম থেকে ওঠার আমলের মধ্যে শুধু দোয়াই নয়, রাতের ইবাদতের প্রস্তুতির কথাও সহিহ হাদিসে পাওয়া যায়। হজরত হুযাইফা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) রাতের নামাজের জন্য উঠলে মিসওয়াক করতেন। সহিহ মুসলিমে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ ঘুম থেকে উঠে ইবাদতের প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি পরিচ্ছন্নতাকে গুরুত্ব দিতেন।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। “রাসুল (সা.) ঘুম থেকে উঠে প্রথমে কী করতেন”—এই প্রশ্নের উত্তরে বিভিন্ন বর্ণনায় ঘুম থেকে ওঠার পর আল্লাহর প্রশংসার দোয়া এবং রাতের নামাজের জন্য উঠলে মিসওয়াক করার কথা পাওয়া যায়। তাই একটি আমলকে সব পরিস্থিতিতে “অবশ্যই প্রথম কাজ” হিসেবে উল্লেখ করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট সহিহ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী বিষয়টি বোঝা বেশি সঠিক। সহিহ বুখারির সরাসরি বর্ণনা অনুযায়ী, ঘুম থেকে জেগে তিনি আল্লাহর প্রশংসার এই দোয়াটি পড়তেন।

ঘুম থেকে ওঠার পর এই দোয়া পড়ার মাধ্যমে একজন মুসলমান দিনের শুরুতেই আল্লাহকে স্মরণ করতে পারেন। সকালে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল ফোন দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকে পড়া বা দিনের ব্যস্ততা শুরু করার পরিবর্তে কয়েক মুহূর্ত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা একজন মুমিনের জন্য সুন্দর অভ্যাস হতে পারে। কারণ একটি নতুন সকাল পাওয়াই আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় নিয়ামত। গত রাত পর্যন্ত যে মানুষটি জীবিত ছিল, সে সকালে আবার চোখ খুলেছে—এটি আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া সম্ভব নয়।

এই দোয়ার মধ্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। মানুষ প্রতিদিন ঘুমায় এবং প্রতিদিন জেগে ওঠে। কিন্তু প্রতিটি সকালই তাকে মনে করিয়ে দেয় যে জীবন আল্লাহর হাতে। তাই ঘুম থেকে ওঠার পর আল্লাহর প্রশংসা করা শুধু একটি মুখস্থ দোয়া নয়; বরং নিজের জীবনের প্রতি নতুন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি সুযোগ। একজন মুসলমান যদি এই দোয়ার অর্থ বুঝে পড়েন, তাহলে তার দিনের শুরুতেই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও আখিরাতের কথা স্মরণ করার সুযোগ তৈরি হয়।

ঘুম থেকে ওঠার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই সুন্নত আমল অনুসরণ করা অত্যন্ত সহজ। ঘুম ভাঙার পর প্রথমেই আল্লাহর প্রশংসার এই দোয়া পড়া যায়। এরপর নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী আল্লাহর কাছে দোয়া করা, ওজু করা এবং নামাজের প্রস্তুতি নেওয়া যায়। কেউ যদি রাতের শেষভাগে তাহাজ্জুদের জন্য ওঠেন, তাহলে মিসওয়াক করা এবং ওজু করে নামাজ আদায় করার আমলও সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

তবে এই আমলগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয় যে, ঘুম থেকে ওঠার পর কোনো নির্দিষ্ট কাজ করলেই জীবনের সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে বা বিশেষ কোনো পার্থিব ফল নিশ্চিতভাবে পাওয়া যাবে। সুন্নতের আমল হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তাঁর শুকরিয়া আদায় এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ করা। এর মাধ্যমে একজন মুসলমান তার দৈনন্দিন জীবনকে ইবাদতের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন।

সব মিলিয়ে বলা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর প্রশংসা করতেন এবং ঘুমের পর জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করতেন। তাই আমাদেরও উচিত ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথমেই আল্লাহকে স্মরণ করা এবং এই দোয়াটি অর্থ বুঝে পড়া। একটি নতুন সকালকে আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে গ্রহণ করে দিন শুরু করলে মানুষের মনে কৃতজ্ঞতা, আখিরাতের স্মরণ এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতার অনুভূতি আরও গভীর হতে পারে।

আজকের শিক্ষা: ঘুম থেকে ওঠার পর মোবাইল বা অন্য কোনো ব্যস্ততার আগে আল্লাহকে স্মরণ করার অভ্যাস করুন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়াটি পড়ুন—“আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বা‘দা মা আমাতানা, ওয়া ইলাইহিন নুশুর।” অর্থ বুঝে পড়ুন এবং মনে রাখুন, প্রতিটি নতুন সকাল আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নতুন সুযোগ।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!