কম বয়সে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও অনেক নারী কিছু শারীরিক পরিবর্তনকে স্বাভাবিক ভেবে এড়িয়ে যান। অনিয়মিত মাসিক, তীব্র মাসিকের ব্যথা কিংবা দীর্ঘদিন ধরে তলপেটে ব্যথার মতো কিছু লক্ষণ কখনো কখনো প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে বন্ধ্যাত্ব হবে, এমন নয়। বরং এগুলো কোনো অন্তর্নিহিত সমস্যার সংকেত হতে পারে, যা দ্রুত শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সুযোগ থাকে।

১. মাসিক অনিয়মিত হওয়া বা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা

নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো নিয়মিত মাসিক চক্র। বারবার মাসিক অনিয়মিত হওয়া, অনেক দেরিতে হওয়া কিংবা কয়েক মাস বন্ধ থাকা অবহেলা করা উচিত নয়।

অনিয়মিত মাসিকের পেছনে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS), থাইরয়েডের সমস্যা, ওজনের বড় পরিবর্তন, অতিরিক্ত ব্যায়াম বা অন্যান্য হরমোনজনিত কারণ থাকতে পারে। এসব সমস্যার কিছু ক্ষেত্রে নিয়মিত ডিম্বস্ফোটন বা ovulation ব্যাহত হয়। ফলে গর্ভধারণ কঠিন হতে পারে।

বিশেষ করে আগে নিয়মিত মাসিক হওয়ার পর হঠাৎ কয়েক মাস ধরে চক্রের পরিবর্তন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। ACOG-ও তরুণীদের নিয়মিত মাসিকের ধরন পরিবর্তন হলে বা টানা তিন মাস মাসিক না হলে কারণ অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দেয়।

তবে মাসিক অনিয়মিত হওয়ার অর্থ সরাসরি বন্ধ্যাত্ব নয়। কারণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রজননক্ষমতা স্বাভাবিক রাখা বা গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ানো সম্ভব।

২. মাসিকের সময় অস্বাভাবিক বা তীব্র ব্যথা

মাসিকের সময় হালকা ব্যথা অনেকেরই হতে পারে। কিন্তু ব্যথা যদি এতটাই বেশি হয় যে দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা বা কর্মজীবন ব্যাহত হয়, নিয়মিত ব্যথানাশকেও না কমে অথবা সময়ের সঙ্গে ব্যথা বাড়তে থাকে, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।

এর পেছনে এন্ডোমেট্রিওসিসসহ কিছু গাইনোকোলজিক্যাল সমস্যা থাকতে পারে। এন্ডোমেট্রিওসিসে জরায়ুর ভেতরের আস্তরণের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে বেড়ে ওঠে। এটি ডিম্বাশয় বা ফ্যালোপিয়ান টিউবের ক্ষতি করে প্রজননক্ষমতায় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া জরায়ুর ফাইব্রয়েডের কারণেও অতিরিক্ত মাসিকের রক্তপাত, তীব্র ব্যথা বা পেলভিক এলাকায় চাপ অনুভূত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ফাইব্রয়েড গর্ভধারণে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই ‘মাসিকের ব্যথা সবারই হয়’ এই ধারণায় তীব্র ব্যথাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা না করাই ভালো।

৩. তলপেটে দীর্ঘদিন ব্যথা বা সহবাসে ব্যথা

তলপেট বা পেলভিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা থাকা, বিশেষ করে মাসিকের বাইরেও ব্যথা অনুভূত হওয়া, চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করার মতো একটি লক্ষণ।

কিছু ক্ষেত্রে পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (PID), এন্ডোমেট্রিওসিস, ফাইব্রয়েড বা প্রজনন অঙ্গের অন্যান্য সমস্যার সঙ্গে এ ধরনের ব্যথার সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষ করে কিছু যৌনবাহিত সংক্রমণ চিকিৎসা না করালে ফ্যালোপিয়ান টিউবে ক্ষত বা দাগ তৈরি হতে পারে, যা পরে গর্ভধারণে সমস্যা করতে পারে।

সহবাসের সময় নিয়মিত ব্যথা হলেও বিষয়টি লজ্জায় গোপন না করে গাইনি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। কারণ ব্যথার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করাই গুরুত্বপূর্ণ।

এই ৩ লক্ষণ দেখলেই কি বন্ধ্যাত্ব নিশ্চিত?

না। এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনিয়মিত মাসিক, ব্যথা বা পেলভিক সমস্যার কোনো একটি লক্ষণ থাকলেই একজন নারী ভবিষ্যতে সন্তান ধারণ করতে পারবেন না এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়।

বন্ধ্যাত্বের কারণ অনেক ধরনের হতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে ডিম্বস্ফোটনের সমস্যা, ফ্যালোপিয়ান টিউবের সমস্যা, এন্ডোমেট্রিওসিস, জরায়ুর কিছু সমস্যা এবং অন্যান্য হরমোনজনিত কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। আবার বন্ধ্যাত্ব শুধু নারীর সমস্যা নয়; পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যাও গর্ভধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই কোনো লক্ষণ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?

যেসব নারীর মাসিক নিয়মিত ছিল কিন্তু হঠাৎ অনিয়মিত হয়ে গেছে, কয়েক মাস মাসিক হচ্ছে না, অস্বাভাবিক রক্তপাত হচ্ছে, তীব্র মাসিকের ব্যথা রয়েছে কিংবা দীর্ঘদিন ধরে পেলভিক ব্যথা হচ্ছে—তাদের গাইনি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

যারা সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের ক্ষেত্রেও সময়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে ৪০ বছরের কম বয়সী দম্পতিদের নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনসম্পর্ক থাকলে এক বছরের মধ্যে গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে। এক বছর চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে বয়স ৩৬ বছর বা তার বেশি হলে, অথবা আগে থেকেই প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে কোনো উদ্বেগ থাকলে আরও আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

কী ধরনের পরীক্ষা করা হতে পারে?

কারণ অনুযায়ী চিকিৎসক বিভিন্ন পরীক্ষা করতে পারেন। মাসিক অনিয়মিত হলে হরমোন পরীক্ষা করে ডিম্বস্ফোটন ঠিকমতো হচ্ছে কি না তা দেখা হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী আল্ট্রাসাউন্ডসহ অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে। ফ্যালোপিয়ান টিউবের সমস্যা বা সংক্রমণের সন্দেহ থাকলেও আলাদা পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।

তাই নিজের ইচ্ছায় হরমোনের ওষুধ বা কোনো ‘ফার্টিলিটি’ সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জীবনযাপনের দিকেও নজর দিন

প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, ধূমপান এড়িয়ে চলা, সুষম খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমের অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত কম বা বেশি ওজনও ডিম্বস্ফোটনে প্রভাব ফেলতে পারে। ধূমপানও নারীর গর্ভধারণের সম্ভাবনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের মাসিক চক্র ও শারীরিক পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকা। কোনো অস্বাভাবিকতা দীর্ঘদিন ধরে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে সম্ভাব্য কারণ শনাক্ত করার সুযোগ বাড়ে।

অনিয়মিত মাসিক, অস্বাভাবিক তীব্র মাসিকের ব্যথা এবং দীর্ঘস্থায়ী পেলভিক বা সহবাসের সময় ব্যথা—এই তিনটি লক্ষণ অবহেলা না করাই ভালো। এগুলো বন্ধ্যাত্বের নিশ্চিত লক্ষণ নয়, তবে PCOS, এন্ডোমেট্রিওসিস, হরমোনজনিত সমস্যা বা প্রজনন অঙ্গের অন্যান্য সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

তাই লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন থাকলে ভয় না পেয়ে গাইনি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ প্রজননস্বাস্থ্যের অনেক সমস্যাই দ্রুত শনাক্ত হলে যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা বা চিকিৎসা করা সম্ভব।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!