একটি দেশ পরিচালনা করা কখনোই নির্দিষ্ট সময়ের দাপ্তরিক কাজ নয়। বিশ্বনেতাদের প্রতিদিনের রুটিনে থাকে গভীর রাতের বৈঠক, ভোরের ব্রিফিং, জরুরি সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সফর এবং অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। ফলে অনেক নেতার জীবনেই ঘুমের সময় কমে আসে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা বিশ্বনেতা কত কম ঘুমিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেন? সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ঘুমের অভ্যাস নিয়ে আলোচনার পর বিষয়টি আবার সামনে এসেছে।
তাকাইচি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন রাতও গেছে, যখন তিনি প্রায় ঘুমাননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে তিনি রাতে শূন্য থেকে তিন ঘণ্টার মতো ঘুমান। এমনকি টানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতে পারাকে তিনি বিরল ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তার এই বক্তব্য জাপানে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। কারণ দেশটিতে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অতিরিক্ত কাজের কারণে মৃত্যুর ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের বিষয়। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, কম ঘুম কি একজন নেতার কর্মক্ষমতার প্রতীক, নাকি দীর্ঘমেয়াদে এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে?
সানায়ে তাকাইচি: শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা ঘুম
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বর্তমানে কম ঘুমানো বিশ্বনেতাদের তালিকায় আলোচনায় রয়েছেন।
তিনি জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তার রাতের ঘুম সাধারণত শূন্য থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সরকারি ছুটির দিনে টানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতে পারাকে তিনি বিশেষ সৌভাগ্য হিসেবে দেখেছেন।
তাকাইচির এই বক্তব্যের পর জাপানে কর্মসংস্কৃতি ও অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়। দেশটিতে ‘কারোশি’ বা অতিরিক্ত কাজের কারণে মৃত্যুর বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
ডোনাল্ড ট্রাম্প: চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে কম ঘুমানো মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, সাধারণত তিনি রাতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি রাত পর্যন্ত কাজ করতেন এবং ভোরেই দিনের কার্যক্রম শুরু করতেন।
ট্রাম্পের এই অভ্যাস তার প্রকাশ্য কর্মপদ্ধতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তিনি নিজেকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, যিনি দীর্ঘ সময় কাজ করতে সক্ষম।
নরেন্দ্র মোদি: তিন থেকে চার ঘণ্টা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তার কম ঘুমের অভ্যাসের কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।
২০১৯ সালে অভিনেতা অক্ষয় কুমারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মোদি বলেন, তিনি সাধারণত তিন থেকে চার ঘণ্টা ঘুমান। তার মতে, অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি গভীর ঘুমাতে পারেন।
তিনি জানান, তার শরীরের নিজস্ব ছন্দ অনুযায়ী এই ঘুমই তার জন্য যথেষ্ট।
ইমানুয়েল মাঁখো: তিন থেকে চার ঘণ্টা
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাঁখোকেও কম ঘুমানো নেতাদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০১৮ সালে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বের শুরুর দিকে ব্যস্ত কর্মসূচির কারণে তিনি রাতে তিন থেকে চার ঘণ্টা ঘুমাতেন।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, যিনি গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতেন এবং নিয়মিত সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
বারাক ওবামা: প্রায় পাঁচ ঘণ্টা
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও ছিলেন রাতজাগা নেতা।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওবামা সাধারণত রাতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতেন। পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবারের পর তিনি কয়েক ঘণ্টা একা কাজ করতেন।
সে সময় তিনি বিভিন্ন নথি পড়তেন, ব্রিফিং পর্যালোচনা করতেন এবং পরবর্তী দিনের প্রস্তুতি নিতেন।
অ্যাঞ্জেলা ম্যার্কেল: ব্যস্ত সময়ে ঘুমের ঘাটতি সামলাতেন
জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা ম্যার্কেলের ঘুমের অভ্যাস ছিল কিছুটা ভিন্ন।
তিনি নিজেকে একটি উটের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তার বক্তব্যের অর্থ ছিল, ব্যস্ত সময়ে কম ঘুম হলেও পরে সেই ঘাটতি পূরণ করার ক্ষমতা তার রয়েছে।
অর্থাৎ তিনি নিজেকে এমন ব্যক্তি হিসেবে দেখাননি, যার নিয়মিতভাবে খুব কম ঘুম প্রয়োজন।
মার্গারেট থ্যাচার: প্রায় চার ঘণ্টা
ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারও কম ঘুমানো নেতাদের মধ্যে পরিচিত ছিলেন।
তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, রাতে চার ঘণ্টার বেশি ঘুমানো তার জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল। তার সাবেক প্রেস সচিবও পরবর্তী সময়ে একই ধরনের তথ্য দিয়েছিলেন।
থ্যাচারের কর্মনিষ্ঠা ও দীর্ঘ সময় কাজ করার অভ্যাস তার রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছিল।
কম ঘুম কি সত্যিই সাফল্যের চাবিকাঠি?
অনেক সময় কম ঘুমানোকে কঠোর পরিশ্রম, দায়িত্বশীলতা বা সফলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তবে ঘুম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিষয়টি এত সরল নয়।
কিছু মানুষ জেনেটিক কারণে স্বাভাবিকভাবেই কম ঘুমিয়েও ভালোভাবে কাজ করতে পারেন। তবে এমন মানুষ খুবই বিরল।
অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
বিশেষ করে যেসব মানুষের সিদ্ধান্ত কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে, তাদের ক্ষেত্রে শুধু কতক্ষণ জেগে থাকা যায় সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো—কম ঘুমের মধ্যেও তারা কতটা পরিষ্কারভাবে চিন্তা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
বিশ্বনেতাদের ব্যস্ত জীবন হয়তো কম ঘুমের উদাহরণ তৈরি করে, কিন্তু সুস্থ শরীর ও কার্যকর নেতৃত্বের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!