বাংলাদেশে অনেক মোটরসাইকেল ও গাড়ির মালিক নিজেদের পছন্দমতো রং পরিবর্তন, ইঞ্জিন বদল, টায়ারের আকার পরিবর্তন বা বাহ্যিক ডিজাইন পরিবর্তন করে থাকেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিভিন্ন ধরনের মডিফাইড বাইক ও গাড়ির ভিডিও নিয়মিত দেখা যায়। তবে অনেকেই জানেন না, বিআরটিএর অনুমতি ছাড়া এ ধরনের পরিবর্তন করলে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া মোটরযানের কারিগরি বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করলে জেল ও বড় অঙ্কের জরিমানার মুখোমুখি হতে হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনটি শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য নয়, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, পিকআপ, সিএনজি, এমনকি অন্যান্য মোটরযানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে বৈধভাবে মডিফিকেশন করার সুযোগ রয়েছে এবং নির্ধারিত নিয়ম মেনে অনলাইন বা অফলাইনে সহজেই বিআরটিএ থেকে অনুমোদন নেওয়া যায়।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী মোটরযানের মডিফিকেশন মূলত তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত রং পরিবর্তন, অর্থাৎ নিবন্ধনের সময় যে রং ছিল তা বদলে নতুন রং করা। দ্বিতীয়ত ইঞ্জিন পরিবর্তন, যেখানে পুরোনো বা নষ্ট ইঞ্জিনের বদলে নতুন ইঞ্জিন লাগানো হয়। তৃতীয়ত কাঠামোগত পরিবর্তন, যেমন সিএনজি বা এলপিজিতে রূপান্তর, আসনের সংখ্যা পরিবর্তন, টায়ারের সাইজ পরিবর্তন কিংবা বাহ্যিক অবয়বের পরিবর্তন।

তবে মডিফিকেশনের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গাড়ির সব কাগজপত্র হালনাগাদ থাকা। ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস সনদ এবং অন্যান্য ফি পরিশোধ না থাকলে বিআরটিএর সিস্টেমে আবেদন সম্পন্ন করা যাবে না। অনেক আবেদনকারী এই ধাপেই সমস্যায় পড়েন।

বর্তমানে বিআরটিএ অনলাইন ও অফলাইন—দুই পদ্ধতিতেই আবেদন গ্রহণ করছে। অনলাইনে আবেদন করতে হলে bsp.brta.gov.bd পোর্টালে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে লগইন করতে হবে। এরপর “মোটরযানের তথ্য পরিবর্তন/সংশোধন” অপশনে গিয়ে রং, ইঞ্জিন, টায়ার সাইজ বা অন্যান্য পরিবর্তনের তথ্য দিতে হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান করে আপলোড করার পর নির্ধারিত ফি অনলাইনে পরিশোধ করা যাবে।

যারা অনলাইনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না, তারা সরাসরি বিআরটিএ সার্কেল অফিসে গিয়ে আবেদন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফরম সংগ্রহ, ব্যাংকে ফি জমা এবং সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) বরাবর লিখিত আবেদন করতে হয়। কেন পরিবর্তন করা হচ্ছে, সেটিও সেখানে উল্লেখ করতে হয়।

বিআরটিএ ফি ক্যালকুলেটর অনুযায়ী বর্তমানে মডিফিকেশন অনুমোদনের সরকারি ফি ও ভ্যাট মিলিয়ে ৩ হাজার ৬৯০ টাকা। অনলাইনে বিকাশ বা অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অথবা ব্যাংকে সরাসরি এই টাকা জমা দেওয়া যায়। আগে আর্থিক সহায়তা কর (Financial Assistance Tax) পরিশোধ না করা থাকলে অতিরিক্ত ১ হাজার ১৫০ টাকা দিতে হতে পারে।

আবেদনের সঙ্গে যে কাগজপত্র প্রয়োজন হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মূল নিবন্ধন সনদ বা ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, হালনাগাদ ট্যাক্স টোকেন ও ফিটনেস সনদ, মালিকের জাতীয় পরিচয়পত্র, ই-টিন সনদ এবং ইঞ্জিন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নতুন ইঞ্জিনের বিল, ইনভয়েস, বিল অব এন্ট্রি ও বিক্রয়কারীর ক্যাশ মেমো।

আবেদন ও ফি জমা দেওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বিআরটিএর পরিদর্শন। মডিফিকেশন করা বাইক বা গাড়িটি নির্ধারিত সময়ে সার্কেল অফিসে নিয়ে যেতে হবে। মোটরযান পরিদর্শক সরাসরি গাড়ি পরীক্ষা করবেন। পরিবর্তনটি নিরাপদ ও আইনসম্মত হলে অনুমোদনের সুপারিশ করা হবে। এরপর গ্রাহক অস্থায়ী রেজিস্ট্রেশন সনদ পাবেন এবং পরবর্তীতে নতুন স্মার্ট কার্ড প্রস্তুত হলে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হবে।

আইন ভঙ্গ করলে শাস্তিও বেশ কঠোর। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৮৪ ধারা অনুযায়ী বিআরটিএর অনুমতি ছাড়া মোটরযানের কারিগরি বিনির্দেশ পরিবর্তন করলে সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড, ন্যূনতম ১ বছর কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে।

সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকেই উচ্চ শব্দের সাইলেন্সার, অতিরিক্ত বড় টায়ার, বিপজ্জনক এলইডি লাইট বা অননুমোদিত ইঞ্জিন ব্যবহার করেন, যা শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ায়। তাই যেকোনো পরিবর্তনের আগে বিআরটিএর অনুমতি নেওয়া এবং নিরাপদ মডিফিকেশন বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বিআরটিএ আরও জানিয়েছে, তাদের অনলাইন সেবাসমূহ নিয়মিত আপডেট করা হচ্ছে। ফলে আবেদন পদ্ধতি, ফি বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভবিষ্যতে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে সর্বশেষ তথ্য বিআরটিএর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে জেনে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!