বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতকে আরও শক্তিশালী করতে সরকার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ, আইসিটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। তিনি বলেন, টেলিকম খাতে কর কমানো, উন্নত মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড সংযোগ, ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সাইবার নিরাপত্তায় দক্ষ জনবল তৈরি এবং ইলেকট্রনিকস উৎপাদন—এই পাঁচটি ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে নতুন নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

রোববার (৯ আগস্ট) রাজধানীর দ্য ওয়েস্টিন ঢাকায় আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচ্যাম) আয়োজিত ‘অ্যাক্সিলারেটিং বাংলাদেশ’স ডিজিটাল ফিউচার: পলিসি প্রায়োরিটিজ ফর ইনোভেশন, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড আইসিটি-লেড গ্রোথ’ শীর্ষক নীতি সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, সরকার তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতকে দেশের অন্যতম ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ হিসেবে বিবেচনা করছে। এ খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতি অপরিহার্য বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি টেলিযোগাযোগ খাতে বিদ্যমান কর কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, বিশ্বে টেলিকম খাতে কার্যকর করের হার গড়ে ২২ থেকে ২৭ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা ৫১ থেকে ৫৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এই উচ্চ করহার বিনিয়োগ ও সেবার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে সিমের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহারের বিষয়েও সরকার নীতিগতভাবে আলোচনা করছে বলে জানান।

রেহান আসিফ আসাদ বলেন, গ্রাহকসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে থাকলেও মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড সেবার মান এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই সরকারের দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হচ্ছে সারাদেশে উন্নত মানের মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড সংযোগ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে নির্ভরযোগ্য ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট এখন মৌলিক অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে।

তৃতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে তিনি ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ ধারণার কথা তুলে ধরেন। এস্তোনিয়ার ‘এক্স-রোড’ মডেলের আদলে একটি সমন্বিত ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকের পরিচয়, ব্যাংক হিসাব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য একীভূত করা হবে এবং এটি ব্যবহারের জন্য কোনো ফি নেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।

চতুর্থ অগ্রাধিকার হিসেবে তিনি এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ২৩ হাজার থেকে ৩০ হাজার প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক বের হচ্ছেন। তাদের আন্তর্জাতিক মানের এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও ডেটা দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করতে সরকার কাজ করবে। পাশাপাশি স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যক্রমেও এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

ইলেকট্রনিকস উৎপাদন খাতকে সরকারের পঞ্চম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ খাতে তৈরি পোশাক শিল্পের মতো প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এক দশকে দেশটির ভোক্তা ইলেকট্রনিকস রপ্তানি ১০০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশও সঠিক নীতি সহায়তা পেলে এই খাতে বড় সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) গবেষণা অনুযায়ী, ব্রডব্যান্ডের বিস্তার ১০ শতাংশ বাড়লে জাতীয় জিডিপি প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তাই ডিজিটাল অবকাঠামো সম্প্রসারণ কেবল প্রযুক্তিখাত নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

অনুষ্ঠানে অ্যামচ্যামের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন (পিডিপিএ) অনুমোদনের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আইনটির চূড়ান্ত সংস্করণে অ্যামচ্যামের বেশিরভাগ সুপারিশ প্রতিফলিত হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের অর্থ আইনে ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কর অব্যাহতি এবং ডিজিটাল ডিভাইস ও সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট উপকরণ আমদানিতে শুল্ক সুবিধাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সংলাপে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা ডিজিটাল অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ, আস্থাশীল ডিজিটাল অবকাঠামো, এআই উদ্ভাবন, দক্ষ জনবল ও সরকার-বেসরকারি অংশীদারত্ব নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে ওপেন-লুপ টিকিটিং, বাংলা কিউআর, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক সংযুক্তি, ক্লাউড নীতি ও ডেটা সুরক্ষা আইনের সমন্বয় এবং জাতীয় ডেটা গভর্ন্যান্স কর্তৃপক্ষ দ্রুত গঠনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

এক প্রশ্নের জবাবে রেহান আসিফ আসাদ জানান, আরএফআইডিভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় টোল আদায় ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু রয়েছে এবং বাংলা কিউআরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।

তিনি জাতীয় সাইবার নিরাপত্তাকে সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে জাতীয় এআই নীতি প্রণয়নের কাজ শুরু হবে। এ জন্য সরকার, বেসরকারি খাত, শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের সমন্বয়ে একটি যৌথ দল গঠন করা হবে।

ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে সাবমেরিন ক্যাবল সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বর্তমানে দেশের সাবমেরিন ক্যাবল সক্ষমতা ৬ টেরাবাইট হলেও চাহিদা ১২ টেরাবাইটে পৌঁছেছে। প্রতি দুই বছর পরপর ডেটা ট্রাফিক প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনে দুই থেকে তিন বছর সময় লাগে। তাই ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় এখনই সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!