কিলিয়ান এমবাপ্পে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা ছয় খেলোয়াড়ের একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন, আর সেখানে নিজের নামও রেখে দিয়েছেন। এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়ে যায়। মজার বিষয় হলো, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্টে তালিকার ক্রম নিয়ে কিছুটা ভুল তথ্য দেখা গেছে—অনেকে বলছেন প্লাতিনি পাঁচে আর এমবাপ্পে ছয়ে, কিন্তু আসল তালিকায় ব্যাপারটা উল্টো। এমবাপ্পে নিজেকে পাঁচ নম্বরে রেখেছেন, আর প্লাতিনিকে দিয়েছেন ছয় নম্বর স্থান।
পুরো তালিকাটা এমন—সবার উপরে আছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে, তারপর আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি, এরপর দিয়েগো মারাদোনা। চতুর্থ স্থানে ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান, পঞ্চম স্থানে স্বয়ং এমবাপ্পে, আর সবশেষে মিশেল প্লাতিনি। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, এই তালিকায় তিনজনই ফরাসি খেলোয়াড়—জিদান, প্লাতিনি আর এমবাপ্পে নিজে।
তবে এই তালিকার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটা হলো যাকে নিয়ে ফুটবল বিশ্বে বছরের পর বছর ধরে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়, সেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর নামই এখানে নেই। যিনি সাধারণভাবে সর্বকালের সেরা তিন-চারজনের তালিকায় প্রায় সবসময় থাকেন, তাকে বাদ দেওয়াটা অনেকের কাছেই অবাক করার মতো লেগেছে।
কিন্তু এর পেছনে কারণটা আসলে খুব সহজ এই তালিকাটা সার্বিকভাবে “সর্বকালের সেরা ফুটবলার” নিয়ে নয়, বরং নির্দিষ্টভাবে “বিশ্বকাপ ইতিহাসের” সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে করা। আর এই জায়গাতেই রোনালদোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ক্যারিয়ার সত্ত্বেও তিনি কখনো বিশ্বকাপ জিততে পারেননি।
পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলেও শিরোপার স্বাদ না পাওয়াটাই তাকে এই বিশেষ তালিকা থেকে বাদ পড়ার মূল কারণ। ক্লাব ফুটবলে তিনি যত বড় নামই হোন না কেন, বিশ্বকাপের মঞ্চে তার প্রভাব পেলে, মেসি, মারাদোনা বা জিদানের মতো নির্ধারক ছিল না অন্তত এমবাপ্পের বিচারে।
পেলেকে সবার উপরে রাখার পেছনে যুক্তি খুব সহজ। তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছেন—১৯৫৮, ১৯৬২ আর ১৯৭০ সালে। এত বছর পরও এই রেকর্ড অক্ষত আছে। মেসিকে দুইয়ে রাখার কারণ হলো কাতার বিশ্বকাপের সেই অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স—সাত গোল আর তিন অ্যাসিস্ট করে গোল্ডেন বল জেতা।
মারাদোনা তিনে, কারণ ১৯৮৬ বিশ্বকাপে তার একক নৈপুণ্য এখনো ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। জিদানকে চারে রাখা হয়েছে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতানোর ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকার জন্য।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত অংশটা অবশ্য এমবাপ্পের নিজেকে পঞ্চম স্থানে রাখা, প্লাতিনির উপরে। এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি সরাসরি বলেছেন, বিশ্বকাপে তিনি প্লাতিনির চেয়ে বেশি কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।
আর এই কথার পেছনে সত্যিই বেশ শক্ত যুক্তি আছে। ২০২২ বিশ্বকাপে তিনি আট গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন, যা মেসির চেয়েও এক গোল বেশি। ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে ফ্রান্স হেরে যায়। এমনকি ২০১৮ আর ২০২২ দুই বিশ্বকাপ ফাইনাল মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা চার, যা এখন পর্যন্ত কোনো খেলোয়াড় বিশ্বকাপ ফাইনালে করতে পারেননি।
সবচেয়ে বড় কথা, ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি দশ গোল করে টানা দ্বিতীয়বার গোল্ডেন বুট জিতে নেন, আর ক্যারিয়ার মিলিয়ে মোট বাইশ বিশ্বকাপ গোল করে মেসি ও মিরোস্লাভ ক্লোজেকে পেছনে ফেলে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেন। এই পরিসংখ্যানগুলো দেখলে বোঝা যায়, নিজেকে তালিকায় রাখাটা নিছক অহংকার নয়, বরং তার কাছে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছে।
তালিকা প্রকাশের পর স্বাভাবিকভাবেই সামাজিক মাধ্যমে দুই পক্ষ তৈরি হয়ে গেছে। একদল বলছেন, এমবাপ্পে নিজের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে যা বলেছেন তা মোটেও অযৌক্তিক নয়।
আবার আরেক দল রোনালদোর অনুপস্থিতি নিয়েই বেশি হতাশ, কারণ ক্লাব পর্যায়ে তার অর্জন অবিশ্বাস্য হলেও শুধু বিশ্বকাপের মানদণ্ডে বিচার করলে তাকে বাদ দেওয়াটা যুক্তিসঙ্গত মনে করছেন অনেকে। মূলত বিশ্বকাপের মঞ্চে কে কতটা প্রভাব ফেলেছেন, সেটাই এখানে বিচার্য বিষয়, আর সেই মাপকাঠিতেই রোনালদো পিছিয়ে পড়েছেন।
সব মিলিয়ে, ফুটবলের “সর্বকালের সেরা কে” এই প্রশ্নটা এমনিতেই বহু বছর ধরে বিতর্কিত, আর এবার এমবাপ্পে নিজেই সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে দিলেন। রোনালদোর অনুপস্থিতি এই তালিকাকে আরও বেশি আলোচিত করে তুলেছে।
তথ্যসূত্র : Diario Olé, Yahoo Sports
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!