২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নাটকীয় দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। দীর্ঘ আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার তীব্র চাপের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেন। সেদিন তার সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। ঘটনার দুই বছর পর বিভিন্ন সূত্র ও কূটনৈতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে সেই দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—শেখ হাসিনার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ও ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান কেন শেষ মুহূর্তেও তার সঙ্গে দেশ ছাড়তে পারেননি।

একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, ৫ আগস্ট সকালে গণভবনে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছিল এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল। এ অবস্থায় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে তাদের সঙ্গে সীমিত সংখ্যক বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

গণভবনের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে অবগত একজন কর্মকর্তা জানান, শেখ হাসিনা তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীকে ফোন করে দ্রুত বিমানবন্দরে পৌঁছাতে বলেন। ওই তালিকায় ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সালমান এফ রহমানকে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে পারেননি।

ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে একটি কথিত অডিও রেকর্ডিং ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সালমান এফ রহমানকে দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে আসার অনুরোধ করতে শোনা যায় বলে দাবি করা হয়। যদিও ওই অডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবু এটি ঘটনাটিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।

কূটনৈতিক একটি সূত্র দাবি করেছে, ওই সময় সালমান এফ রহমান সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের শেষ প্রচেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন। সূত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ঢাকায় অবস্থানরত একটি প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশের ভারপ্রাপ্ত দূতের সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন। পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাওয়ায় সেই বৈঠক শেষ করতে গিয়ে তিনি মূল্যবান সময় হারান। ফলে তেজগাঁওয়ের পুরোনো বিমানবন্দরে সময়মতো পৌঁছানো তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

আরও জানা গেছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার জন্য একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ প্রস্তুত ছিল। কিন্তু তখন বিমানবন্দর এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, সেনাবাহিনীর ব্যারিকেড ভেঙে বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারী বিমানবন্দরের আশপাশে প্রবেশ করলে সেখানে পৌঁছানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তার জন্য অপেক্ষা না করেই রওনা হন।

সালমান এফ রহমান শুধু দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের একজন নন, আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা ও রাজনীতির সংযোগস্থলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বিনিয়োগ এবং কূটনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও তাকে সক্রিয় দেখা যেত। পশ্চিমা ও এশীয় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে তিনি প্রায়ই সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নিতেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি সরকারের পতনের কাহিনি নয়; বরং ক্ষমতার কেন্দ্রের ভেতরের যোগাযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শেষ মুহূর্তের সমন্বয় কতটা ভেঙে পড়েছিল, সেটিও এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়। সালমান এফ রহমানের ফ্লাইট মিস করার ঘটনাকে তারা সেই দিনের অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবেও দেখছেন।

শেখ হাসিনা ভারতে যাওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসে। এরপর নিরাপত্তা বাহিনী আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযান শুরু করে। সালমান এফ রহমানের অবস্থান জানতে দেশজুড়ে তল্লাশি চালানো হয়। পরে নৌপথে পালানোর চেষ্টা করার সময় ঢাকার সদরঘাট এলাকা থেকে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছিল।

তবে ৫ আগস্টের সেই নাটকীয় দিনের পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিভিন্ন সূত্র, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, কূটনৈতিক মহলের তথ্য এবং পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত উপাত্তের ভিত্তিতেই ঘটনাটির একটি সামগ্রিক চিত্র উঠে এসেছে। ফলে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ এবং সালমান এফ রহমানের শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট মিস করার ঘটনা এখনো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যঘেরা অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে।

তথ্যসূত্র: ডেইলি ওয়াদা

ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!