যুক্তরাষ্ট্রের টেলিযোগাযোগ খাতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান SpaceX। স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা Starlink-এর সফলতার পর এবার পূর্ণাঙ্গ মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এই ঘোষণার পরই মার্কিন টেলিকম খাতের শীর্ষ তিন অপারেটর Verizon, AT&T এবং T-Mobile-এর শেয়ারের দামে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, SpaceX-এর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটির আয়-ব্যয়ের প্রতিবেদন প্রকাশ-পরবর্তী এক কনফারেন্স কলে SpaceX-এর প্রেসিডেন্ট গুইন শটওয়েল জানান, প্রতিষ্ঠানটি কেবল স্যাটেলাইটনির্ভর সংযোগেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। তারা স্থলভিত্তিক (Terrestrial) মোবাইল অবকাঠামোও গড়ে তুলতে চায়, যাতে Starlink-কে একটি পূর্ণাঙ্গ মোবাইল সেবায় রূপ দেওয়া যায়।
তিনি বলেন, EchoStar-এর কাছ থেকে কেনা স্পেকট্রামে স্থলভিত্তিক ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে এবং সেই সুবিধা কাজে লাগিয়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ তিন মোবাইল অপারেটরের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রাহক আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে SpaceX।
এর আগে গত বছর দুটি পৃথক চুক্তির মাধ্যমে EchoStar-এর কাছ থেকে মোট ৬৫ মেগাহার্টজ ওয়্যারলেস স্পেকট্রাম লাইসেন্স প্রায় ১৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে অধিগ্রহণ করে SpaceX। এই স্পেকট্রাম ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে নিজস্ব মোবাইল সেবা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
SpaceX-এর এ ঘোষণার পরই মার্কিন শেয়ারবাজারে টেলিযোগাযোগ খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দর কমে যায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, ভবিষ্যতে Starlink মোবাইল বাজারেও বড় প্রতিযোগী হয়ে উঠতে পারে।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, কেবল স্পেকট্রাম লাইসেন্স থাকলেই একটি সফল মোবাইল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব নয়। গত তিন দশকে Verizon, AT&T এবং T-Mobile বিপুল বিনিয়োগ করে সারাদেশে সেল টাওয়ার, ফাইবার নেটওয়ার্ক, স্পেকট্রাম এবং গ্রাহকসেবা অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। সেই অবস্থানে পৌঁছাতে SpaceX-এর বহু বছর সময় এবং বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান MoffettNathanson-এর বিশ্লেষক ক্রেইগ মোফেট বলেন, যদি SpaceX কোনো মোবাইল ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক অপারেটর (MVNO) চুক্তি না করতে পারে, তাহলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সরাসরি গ্রাহকদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক মোবাইল সেবা চালু করা অত্যন্ত কঠিন হবে।
অন্যদিকে Hargreaves Lansdown-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ম্যাট ব্রিটজম্যানের মতে, নতুন নেটওয়ার্ক শূন্য থেকে তৈরি করার পরিবর্তে ছোট কোনো মোবাইল অপারেটর বা তাদের অবকাঠামো অধিগ্রহণ করাই SpaceX-এর জন্য সবচেয়ে দ্রুত এবং বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে। কারণ বিদ্যমান বড় অপারেটরগুলো সম্ভাব্য প্রতিযোগীকে নিজেদের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ দিতে চাইবে না।
SpaceX-এর প্রেসিডেন্ট গুইন শটওয়েল অবশ্য মোবাইল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে কত ব্যয় হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেননি। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির এমন কিছু নতুন পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে তুলনামূলক কম খরচে অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে।
বিশ্লেষকদের আরেকটি অংশের মতে, বর্তমানে SpaceX ও Starlink-এর সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক। ইতোমধ্যে T-Mobile-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে Starlink এমন একটি Direct-to-Cell প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, যা মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতার বাইরে থাকা এলাকায়ও সামঞ্জস্যপূর্ণ স্মার্টফোনে সংযোগ দিতে সক্ষম। বর্তমানে এটি T-Mobile-এর নেটওয়ার্কের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।
তবে SpaceX যদি ভবিষ্যতে স্যাটেলাইট এবং স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্ক একসঙ্গে ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ মোবাইল সেবা চালু করতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন প্রতিযোগিতার সূচনা হতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। যদিও সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রযুক্তিগত, আর্থিক এবং অবকাঠামোগত অনেক বড় চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে।
সূত্র: Reuters
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!