মানুষের জীবনে ভাগ্য বা তকদির নিয়ে ভাবনা বহু পুরোনো। যুগে যুগে মানুষ জানতে চেয়েছে—জীবনের প্রতিটি ঘটনা কি আগে থেকেই নির্ধারিত, নাকি মানুষের সিদ্ধান্ত ও কাজেরও কোনো ভূমিকা রয়েছে? যদি সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে আগে থেকেই নির্ধারিত হয়, তাহলে মানুষ কেন তার ভালো-মন্দ কাজের জন্য জবাবদিহি করবে—এ প্রশ্নও অনেকের মনে আসে।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, ভাগ্যে বিশ্বাস করলে মানুষ হয়তো কর্মবিমুখ হয়ে পড়বে। কিন্তু ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে তকদিরের ধারণা মানুষকে অলস বা নিষ্ক্রিয় করে না; বরং এটি মানুষকে দায়িত্বশীলভাবে চেষ্টা করতে শেখায় এবং ফলাফলের বিষয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে উৎসাহ দেয়।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, তকদিরের মূল বিষয় হলো—আল্লাহর সর্বজ্ঞতা এবং মানুষের ইচ্ছা ও দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বোঝা। মানুষ যদি তকদিরকে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত বানায়, অথবা মানুষকে সম্পূর্ণ স্বাধীন মনে করে আল্লাহর ইচ্ছা ও জ্ঞানকে অস্বীকার করে, তখনই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
মানুষকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে?
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“আমি জিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।”
(সুরা জারিয়াত: ৫৬)
এই আয়াতের অর্থ এমন নয় যে মানুষকে বাধ্য করে ইবাদত করানো হবে। কারণ আল্লাহ মানুষকে বিবেক, বুদ্ধি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন। আর যে কাজের ভিত্তিতে পুরস্কার বা শাস্তি নির্ধারিত হবে, তা অবশ্যই মানুষের ইচ্ছা ও পছন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে।
তাফসিরবিদদের মতে, এই আয়াতের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহর আনুগত্যের পথে আহ্বান করা। মানুষ ফেরেশতার মতো নয়, যারা সবসময় বাধ্যগতভাবে আল্লাহর নির্দেশ পালন করে। বরং মানুষকে পরীক্ষা ও দায়িত্বের জীবনের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যেখানে সে নিজের বিবেচনায় ভালো বা মন্দ পথ বেছে নেয়।
তকদির ও মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা
ইসলামি দর্শনে আল্লাহর ইচ্ছাকে দুইভাবে দেখা যায়।
প্রথমত, এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যেমন—কোথায় জন্ম হবে, কার পরিবারে জন্ম হবে, মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য কেমন হবে, কখন মৃত্যু আসবে—এসব বিষয় আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মের অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিতীয়ত, মানুষের নৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো। যেমন—সত্য বলা বা মিথ্যা বলা, ভালো কাজ করা বা অন্যায় কাজে জড়ানো, মানুষের প্রতি ভালো আচরণ করা বা ক্ষতি করা—এসব ক্ষেত্রে মানুষকে বেছে নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
মানুষের মর্যাদা এখানেই যে, সে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার কারণেই মানুষ তার কাজের জন্য প্রশংসা বা সমালোচনার যোগ্য হয়।
আল্লাহ আগে থেকে জানেন, তাহলে মানুষ দায়ী কেন?
তকদির নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—আল্লাহ যদি আগে থেকেই জানেন মানুষ ভবিষ্যতে কী করবে, তাহলে মানুষ কি বাধ্য?
এর উত্তর হলো, জানা আর বাধ্য করা এক বিষয় নয়।
একজন শিক্ষক যদি দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কারণে বুঝতে পারেন কোন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো করবে বা খারাপ করবে, তার এই ধারণা শিক্ষার্থীকে ভালো বা খারাপ করতে বাধ্য করে না। শিক্ষার্থী নিজের চেষ্টা ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফলাফল অর্জন করে।
একইভাবে আল্লাহ মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। কিন্তু সেই জ্ঞান মানুষকে কোনো কাজ করতে বাধ্য করে না। মানুষ নিজের ইচ্ছা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই কাজ করে।
তকদিরের অজুহাতে কাজ ছেড়ে দেওয়া ইসলাম সমর্থন করে না
ইসলাম কখনো ভাগ্যের নামে কর্মহীন হয়ে বসে থাকতে শেখায় না। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সাহাবিদের এমন প্রশ্নের জবাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সাহাবিরা জানতে চেয়েছিলেন, সবকিছু যদি আগে থেকেই লেখা থাকে, তাহলে কি আমরা কাজ ছেড়ে দেব?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
“তোমরা কাজ করে যাও। কারণ প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সেই কাজ সহজ করে দেওয়া হবে, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।”
(সহিহ বুখারি: ৪৯৪৭)
এই হাদিসের শিক্ষা হলো—মানুষের দায়িত্ব হলো চেষ্টা করা। আর ফলাফল আল্লাহর ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার ওপর ছেড়ে দেওয়া।
পথ সহজ করে দেওয়া মানে মানুষকে বাধ্য করা নয়। মানুষ যে পথে যেতে চায় এবং যে কাজের চেষ্টা করে, আল্লাহ তার জন্য সেই পথ সহজ করে দেন।
তকদিরে বিশ্বাস মানুষের জীবনে কী প্রভাব ফেলে?
তকদিরে সঠিক বিশ্বাস মানুষের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ তৈরি করে।
প্রথমত, সফল হলে সে অহংকারী হয় না। কারণ সে জানে, তার সামর্থ্য ও সুযোগ আল্লাহর দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, ব্যর্থ হলে সে হতাশায় ভেঙে পড়ে না। কারণ সে বিশ্বাস করে, আল্লাহর সিদ্ধান্তের মধ্যে কোনো না কোনো কল্যাণ রয়েছে।
তৃতীয়ত, তকদিরে বিশ্বাস মানুষকে দায়িত্বশীল করে। কারণ সে জানে, চেষ্টা করা তার দায়িত্ব, কিন্তু ফলাফল আল্লাহর হাতে।
তকদির নয়, ভুল বোঝাই সমস্যার কারণ
অনেক সময় মানুষ তকদিরের ধারণাকে ভুলভাবে ব্যবহার করে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চায়। কেউ পরিশ্রম না করে বলে, ‘ভাগ্যে থাকলে পাব।’ আবার কেউ অন্যায় কাজ করে বলে, ‘এটা তো আমার ভাগ্যে ছিল।’
ইসলামের শিক্ষা হলো—মানুষকে সঠিক পথে চেষ্টা করতে হবে, অন্যায় থেকে দূরে থাকতে হবে এবং নিজের কাজের জন্য জবাবদিহির মানসিকতা রাখতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, তকদির মানুষের হাত-পা বেঁধে দেওয়ার কোনো ধারণা নয়। বরং এটি মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন শিক্ষা দেয়। চেষ্টা, পরিশ্রম ও সৎ কর্মের মাধ্যমে মানুষ তার দায়িত্ব পালন করবে, আর ফলাফলের বিষয়ে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখবে—এটাই তকদিরে বিশ্বাসের প্রকৃত শিক্ষা।
FAQ
প্রশ্ন: তকদিরে বিশ্বাস করলে কি মানুষ কর্মবিমুখ হয়ে যায়?
উত্তর: না, ইসলামে তকদিরে বিশ্বাস মানুষকে কাজ ছেড়ে দিতে বলে না। বরং চেষ্টা করা ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা দেয়।
প্রশ্ন: আল্লাহ আগে থেকেই জানলে মানুষের স্বাধীনতা কোথায়?
উত্তর: আল্লাহর জ্ঞান মানুষকে কোনো কাজ করতে বাধ্য করে না। মানুষ নিজের ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ করে।
প্রশ্ন: ইসলাম অনুযায়ী মানুষের দায়িত্ব কী?
উত্তর: মানুষের দায়িত্ব হলো ভালো কাজের চেষ্টা করা, অন্যায় থেকে দূরে থাকা এবং ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।
ℹ️ আরও কন্টেন্ট নিয়মিত পেতে- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
ℹ️ ভিডিও আকারে কনটেন্ট নিয়মিত পেতে –ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন!